১০০% চ্যালেঞ্জঃ কবরে কোনো আযাব নাই কোনো প্রশ্নও করা হয় না, জলন্ত প্রমাণ আল ক্বুরআন

কবরের আযাব সম্পর্কে যাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে তারা উপরের দুই লাইন পড়েই এরিয়ে গেলে তারা গাফেল/ অমনোযোগি। কারণ, সত্যকে জানার জন্য ক্বুরআন দ্বারা প্রমাণ দেয়া হয়েছে। ক্বুরআন দ্বারা প্রমাণ দেয়ার পরও যারা অনুধাবন করবে না তারা অবশ্য অবশ্যই গাফেল- ৭:১৭৯। কবর আযাবের মতো এতো বড় গুরত্বপূর্ণ বিষয় ক্বুরআন থেকে জানার জন্য সময় ব্যয় করে সত্য-মিথ্যা জানা প্রয়োজন। না হয় ক্বুরআনের ভাষায় সে “আন’আম” অর্থাৎ চার পাওবিশিষ্ট পশু- যারা শোনে না, দেখে না, বোঝে না, অনুধাবন করে না, বা উপলব্ধি করে না- ৭:১৭৯।

কবরে শাস্তি আছে কি নাই তা কেউ দেখে না, জানেও না, তাই তা আমাদের জানার বিষয়ও না। এ বিষয় আল্লাহ আমাদেরকে প্রশ্নও করবেন না। এ বিষয় আলোচনা করারও প্রয়োজন হয় না। কারণ, আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষার জন্য- ৬৭:২। এবং পৃথিবীতে মানুষ পাঠিয়েছেন শুধু মাত্র আল্লাহর এবাদাত করার জন্য- ৫১:৫৬। যারা সঠিক নিয়মে আল্লাহর আদেশ নিষেধ পালন করবে আল্লাহ তাদেরকে পরকালে সুখ-শান্তিতে তথা জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যারা আল্লাহর আইন অমান্য করবে তাদেরকে চিরস্থায়ী শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। কাজেই মানুষের বেচে থাকার পর মৃত্যু, অতঃপর পুনরায় জীবিত করে বিচার করে জান্নাতে বা জাহান্নামে পাঠানোর কথা ক্বুরআনে বলা হয়েছে। এখানে কবরে আযাব বা শাস্তি আছে কি না, তা কারও জানার কথা নয়, জানার বিষয়ও না। এ সব বিতর্কিত বিষয় বাদ দিয়ে পরকালের জাহান্নাম থেকে বাচাঁর জন্য ঈমান ও আমল এবং সৎকর্মের প্রতিযোগিরা করা উচিৎ।


এই সমস্ত কথা যখনই আমি বলি তখনই এক শ্রেণীর মানুষ বলে উঠে তাহলে আপনি কবরের আযাব বিশ্বাস করেন না? তাহলে আপনি রছূলকে বিশ্বাস করেন না? তাহলে আপনি রছূলের হাদীছ বিশ্বাস করেন না? ইত্যাদি। তাদের এই কথার উত্তর দেয়ার জন্যই এই বিষয়গুলো জানার প্রয়োজন হয়েছে। তাই কবর আযাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর আলোচনা শোনা যায়। এক শ্রেণী বলতে থাকে যে, কবরে কোনো আযাব নাই এবং আর এক শ্রেণী বলতে থাকে যে, কবরে ভয়াবহ আযাব হয়। তখন দোনো পক্ষ্যই ক্বুরআন ও হাদীছ থেকে দলীল প্রমাণ ও তাদের যুক্তি উপাস্থাপন করতে থাকে। মজার বিষয় হলো, কবর আযাব সম্পর্ক ক্বুরআন থেকে যখনই দলীল প্রমাণ চাওয়া হয় তখন উভয় পক্ষ্য একই আয়াত উপাস্থাপন করতে থাকে। কিন্তু, একই আয়াত উপাস্থাপন করেও পুরোপুরি কোনো সমাধানে কেউ আসতে পারে না। এমন কি এক পক্ষ অন্য পক্ষের দেয়া আয়াত ও যুক্তি মানতেও রাজি হয় না। তদ্রুপ আমিও কিছু আয়াত ও যুক্তি উপাস্থপন করলাম, বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ বিবেচনা করুন। 

মিনহা খলাক্ব না কুম

[২০:৫৫] (আল্লাহ বলেন) আমি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি; তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং তা থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনবো। ছূরা ত্বহা আয়াত ৫৫।

পৃথিবীতেই মরবে ও উঠানো হবে

[৭:২৫] তিনি বললেনঃ সেই পৃথিবীতেই তোমরা জীবন যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু সংঘটিত হবে এবং সেখান হতেই তোমাদেরকে পুনরায় উঠানো হবে। ছূরা আ’রাফ আয়াত ২৫। অনুবাদঃ মুজিবুর রহমান।

বারঝাখ

বারঝাখ/ বারযাখ বলতে মানুষের মৃত্যুর পর কিয়ামতের আগ পর্যন্ত এই সময়টিকে বারযাখ/ অন্তরায়/ অন্তরাল/ আড়াল/ দেয়াল/ প্রাচীর/ পর্দা/ বা বারঝাখের জীবন বা কবরের জীবন বলা হয়। এখানে যে ভুলটা করা হয় তাহলো “বারঝাখের জীবন বা কবরের জীবন” বলাটাই ভুল। আসলে কবরে কোনো জীবন নাই, তাই “বারঝাখের জীবন বা কবরের জীবন” বলাটা সম্পূর্ণ ভুল। মৃত্যুর আগে মানুষ জীবিত থাকে এবং কিয়ামতের সময় মানুষ পুনরায় জীবিতো হবে এর আগে কেউ জীবিতো নয়। কাজেই “বারযাখ” এর সাথে “জীবন” বলাটা সম্পূর্ণ ভুল। মানুষের মৃত্যুর পর সেই বারঝাখ বা অন্তরায় সম্পর্কে আল্লাহ ক্বুরআনে বলেন-

[২৩:১০০]…যেদিন তাদেরকে পুনরায় উঠানো হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বারঝাখ/ অন্তরায়/ অন্তরাল/ পর্দা। ছূরা মু’মিনূন আয়াত ১০০।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, মানুষের মৃত্যু থেকে পুনরায় জীবিত করার আগ পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে “বারঝাখ বা পরদা”। এই পর্দা থাকার কারণে মৃতো ব্যক্তির নাফছ্ বা আত্মা পৃথবীর এবং পরকালের কিছুই জানতে পারে না। কারণ, মৃত্যুর পর তার আত্মা থাকে নিষ্ক্রিয় এবং তার আমলনামা বা লিপি থাকে ইল্লিয়্যীন এবং ছিজ্জীনে। আবার লক্ষ্য করুন! আল্লাহ বলেছেন যে, “মৃতো ব্যক্তির সামনে কিয়ামত পর্যন্ত “বারঝাখ, পর্দা বা অন্তরায় থাকে”। বোঝার বিষয় হলো, ঐ পর্দা থাকার কারণে এবং মৃতো ব্যক্তির আত্মা নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে পৃথিবীর ও পরকালের কিছুই সে জানতে পারে না। যে কিছুই জানতে পারে না তাকে শাস্তি দেয়া হয় কি করে?

(০১) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই তো প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

কিয়ামতের আগ মুহের্তে আত্মা ছেড়ে দিলে-৮১:৭, আল্লাহর হুকুমে সয়ংক্রিয়ভাবে দেহ গঠন হয়ে দেহের মধ্যে ঐ আত্মা প্রবেশ করবে। শিঙ্গায় ফুক দেয়ার মাধ্যমে কিয়ামাত সংগঠিত হলে ঐ বারঝাখ বা পর্দা শেষ হবে এবং কবরে যা আছে তা উঠানো হবে।


কবর থেকে উঠালে অন্তরের সব প্রকাশ হবে

[১০০:৯-১১] (আল্লাহ বলেন) তবে কি সে জানে না সেই সময় সম্পর্কে যখন কবরে যা আছে তা উঠানো হবে ও অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করা হবে?… ছূরা আদিয়াত আয়াত ৯-১১।

আলোচনাঃ কবরে যা আছে তা উঠানো হবে অর্থাৎ যে দেহো এতোদিন মাটির সাথে মিশে ছিলো আল্লাহর আদেশে সেই দেহো আগের মতো তৈরি হয়েই উঠে আসলেই তার অন্তরের সবকিছুই সে জানতে পারবে। এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, পুনরায় না উঠানো পর্যন্ত কবরবাসী কিছুই জানে না। সেদিনই অন্তরের সব বিষয়াদি পাকাশ করা হবে।

(০২) এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, কবরের কিছুই প্রকাশ্যমান নয় তাই কবরের আযাব সম্পর্কে মৃতো ব্যক্তি কিছুই জানে না, তাই কবরে কোনো আযাবও নাই।


পুনরায় জীবিত করবেন

[৮০:২১-২২] (আল্লাহ বলেন) অতঃপর (আল্লাহ) তার মৃত্যু ঘটান ও তাকে কবরস্থ করা হয়। এরপর যখন ইচ্ছা করবেন তখন তাকে পুনরায় জীবিত করবেন… ছুরা আ’বাছা আয়াত -২১-২২।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, মৃত্যুর পর মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে। আল্লাহর কথা অনুযায়ী বোঝাগেলো যে, পুনরায় জীবিত করার আগ পর্যন্ত মানুষ মৃতো থাকবে। যারা বলেন কবরে শাস্তি দেয়া হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ মৃতো ব্যক্তিকে কিভাবে শাস্তি দেয়া হয়? আল্লাহর কথায় পুনরায় জীবিতো না করা পর্যন্ত সেতো মৃতো। মৃতো মানুষকে শাস্তি দেয়া না দেয়া সমান কথা। কারণ সেতো মৃতো।

(০৩) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

পুনরায় সৃষ্টির অস্তিত্ব ও প্রতিদান দেয়া

[১০:৪] (আল্লাহ বলেন) তাঁর কাছেই তোমাদের সকলকে ফিরে যেতে হবে। আল্লাহর ওয়াদা নিশ্চিত সত্য। তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন। পুনরায় তিনিই আবার সৃষ্টি করবেন যাতে তিনি- যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে- তাদেরকে পূর্ণ ইনসাফের সাথে প্রতিদান দিতে পারেন…। ছূরা ইঊনুছ আয়াত ৪।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, তিনি পুনরায় সৃষ্টি করে তার পর পূর্ণ ইনসাফের সাথে প্রতিদান দিবেন। যারা বলেন কবরে শাস্তি দেয়া হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ আল্লাহ পুনরায় সৃষ্টি না করে কিসের উপর শাস্তি দিবেন? কারণ, যেখানে সৃষ্টির অস্তিত্বই নাই সেখানে শাস্তি হবে কিসের উপরে? সৃষ্টি না করেই কি কাউকে শাস্তি দেয়া যায়?

(০৪) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই তো প্রমাণ হয় যে, সৃষ্টির অস্তিত্ব না থাকাতে কবর আযাব বলে কোনো শাস্তিই নাই।

আল্লাহ বললেন, পুনরায় সৃষ্টি করে প্রতিফল দেবেন, আর আপনারা বলছেন সৃষ্টির আগেই আল্লাহ প্রতিফল দেয়া শুরু করেন, তাহলে আল্লাহ কি দুই রকম কথা বলেন? (মা’আজাল্লাহ) তার মানে আপনারা আল্লাহর কথা মানছেন না। তার মানে আল্লাহর কথা বাদ দিয়ে আপনাদের কথা মানতে হবে কি? এই আয়াতের আরও একটি বিষয় তাহলো, আল্লাহ পুনরায় সৃষ্টি করে পূর্ণ ইনসাফের সাথে প্রতিদান দেবেন। যারা বলে কবরে শাস্তি দেয়া হয় তারা আল্লাহ কে বে-ইনসাফ বলে ঘোষনা করলো। কারণ, ইনসাফ হবে বিচারের দিন। কাজেই আল্লাহ বে-ইনসাফ করেন না তাই ইনসাফ ছাড়া কবরে শাস্তিও দিতে পারেন না।

(০৫) এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি হয় না।

ছিজ্জীন এবং ইল্লিয়্যীন

আরবি ডিক্সনারী অনুযায়ী “ছিজ্জীন” অর্থ “কারাগার, কয়েদখানা, জেলখানা, গর্ত, নথি, লিপি ও খাতা। অর্থাৎ ছিজ্জীন হচ্ছে অমোচনীয় লিপি, সিলমোহরকৃত কিতাব বা আমলনামা রাখার স্থান। সেই ছিজ্জীনে রাখা হয় অবিশ্বাসী ও পাপীদের কৃতকর্ম, লিপি বা আমলনামা। এখানে বোঝানো হয়েছে মৃত্যুর পর পাপীদের আমলনামা কিয়ামত পর্যন্ত ছিজ্জীনে রাখা হয়। আর ইল্লিয়্যীন হচ্ছে সেই স্থান যেখানে ঈমানদার বা সৎকর্মশীলদের লিপি, আমলনামা বা সিলমোহরকৃত কিতাব রাখা হয় “কিতাবুম মারকূম”- ৮৩:১। যারা দুনিয়াতে সৎকর্ম করবে তাদের আমলনামার কিতাব ইল্লিয়্যীনে থাকবে, আর যারা অসৎ কর্ম করবে তাদের আমলনামার কিতাব ছিজ্জীনে থাকবে। যখন আল্লাহ আমাদেরকে পুনরায় সৃষ্টি করে বিচারের দিনে একত্রিত করবেন তখন সেই ছিজ্জীন এবং ইল্লিয়্যীন থেকে আমাদের আমলনামার খাতা আনা হবে। আল্লাহ বলেন:

[৮৩:৭-৯] এটা কিছুতেই উচিত নয়, নিশ্চয় পাপাচারীদের আমলনামা আছে ছিজ্জীনে আপনি জানেন, ছিজ্জীন কি? এটা লিপিবদ্ধ খাতা। ছূরা মুতাফফিফীন আয়াত ৭-৯।

[৮৩:১৮-২২] কখনও না, নিশ্চয় সৎলোকদের আমলনামা আছে ইল্লিয়্যীনে। আপনি জানেন ইল্লিয়্যীন কি? এটা লিপিবদ্ধ খাতা। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ একে প্রত্যক্ষ করে। ছূরা মুতাফফিফীন আয়াত ১৮-২২।

আলোচনাঃ উপোরক্ত আয়াত থেকে বুঝতে হবে যে, (১) মৃতো ব্যক্তির আমল নামা কোথায় থাকে? কবরে নাকি ইল্লিয়্যীন-ছিজ্জীনে? (২) মৃতো ব্যক্তি কি জীবি থাকে নাকি মৃতো থাকে? যেহেতু তার সমস্ত আমলনামা ছিজ্জীন এবং ইল্লিয়্যীনে চলে গেছে। (৩) মৃতো ব্যক্তি কি জাগ্রত থাকে নাকি ঘুমিয়ে থাকে? (৪) মৃতো ব্যক্তির রূহ বা আত্মা কোথায় থাকে? (৫) “রূহ” কি?

রূহ

“রূহ” সম্পর্কে মানুষকে সামান্য জ্ঞান দেয়া হয়েছে। “রূহ” কোথাও থাকার বিষয় না। তাই “রূহ” থাকার বা রাখার কোনো কথা আল্লাহ ক্বুরআনে বলেননি, তাই সে বিষয় আমাদের ভাবনা-চিন্তা করাও উচিৎ না। “রূহ” হচ্ছে আল্লাহর একটি আদেশ মাত্র। যখন আল্লাহ আদেশ করেছেন তখন আমরা হয়েছি। অতঃপর আমাদের মৃত্যু হয়। আবার যখন তিনি আদেশ করবেন তখন আমরা হয়ে যাবো। এটা কোথাও থাকা না থাকার বিষয় না, আল্লাহর আদেশই “রূহ”। আল্লাহ বলেন:

[১৭:৮৫] তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিনঃ রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। ছূরা বনী ইছরাঈল আয়াত ৮৫।

আলোচনাঃ আল্লাহ বলেছেন “রূহ” হচ্ছে আল্লাহর আদেশ। আর “নফস” হচ্ছে আত্মা বা প্রাণ- ৮১:৭। এই আত্মা যা আমল করবে বা যা অর্জন করবে তা হচ্ছে আমল বা “কর্ম”। এই আমলনামা যাতে লেখা হয় তা হচ্ছে “লিপি” বা “কিতাব”। এই আমলনামা যারা লিখে রাখেন তারা হচ্ছেন “কিরামান কাতিবী”-৮২:১১। এই আমলনামা বা লিপি থাকবে ইল্লিয়্যীন বা ছিজ্জীনে। যখন আত্মার বাঁধন ছেড়ে দেয়া হবে-৮১:৭, এবং আল্লাহ পুনারায় যখন আদেশ করবেন তখন ঐ আদেশ তথা “রূহ” ঐ নফছের সাথে বা আত্মার সাথে মিলিত হয়ে স্থির হয়ে রবের দিকে ছুটতে থাকবে। সেদিন কোন দিকে ছুটতে হবে তা সকলেই বুঝে নিতে পারবে। কারণ, একটি মাত্র ওয়ে ছাড়া অন্য কোনো পথ সেদিন আর থাকবে না।

যাই হোক আল্লাহ বলেছে “রূহ” সম্পর্কে আমাদের কম জ্ঞান দেয়া হয়েছে তাই এর বেশি পৃথিবীর মানুষ কিছু বলতে পারবে না। তাই আমাদের বুঝে নিতে হবে যে, “রূহ” হচ্ছে আল্লাহর আদেশ। যেমন, আল্লাহ আদমের মধ্যেও আদেশ তথা রূহ ফুঁকে দিয়েছিলেন- ১৫:২৯, ৩৮:৭২। অতঃপর আদমের পৃষ্টদেশ হতে আদমের বংশধর বের করে তাদেরকে ওয়াদা করিয়ে ছিলেন এবং সেই মানুষ পর্যায়ক্রমে পৃথিবীতে আসে, অতঃপর মানুষের মৃত্যু হয়, অতঃপর আত্মা বিহীন বা প্রাণহীন মাটির দেহো মাটিতেই রাখা হয়, অতঃপর আল্লাহ সেই মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন এবং কিয়ামতের সময় আত্মগুলো ছেড়ে দেয়া হবে তারপর বিচার করা হবে। আল্লাহ মরিয়মের মধ্যেও আদেশ তথা “রূহ” ফুঁকে দিয়েছেন- ২১:৯১, ঈছা নবীকেও “রূহ” দ্বারা শক্তি দান করেছেন- ২:৮৭, আল্লাহ আল ক্বুরআনে ছূরা তাকবিরের ৭ নং আয়াতে বলেছেন যে, যখন কিয়ামাত সংঘটিত হবে ঠিক তখনই সেই “নুফূছু”/ “নাফছ্”/নফছ্/ নফস্/ প্রাণ/ আত্মাগুলোকে ছেড়ে দেয়া হবে। 

নফছ/ আত্মা ছেড়ে দেয়া হবে

[৮১:১-৬] (আল্লাহ বলেন) যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে, যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে, যখন পর্বতমালা অপসারিত হবে, যখন পূর্ণ-গর্ভা উষ্ট্রী উপেক্ষিত হবে, যখন বন্য পশুরা একত্রিত হয়ে যাবে, যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে। 

[৮১:৭] দেহে যখন আত্মা পুনঃসংযোজিত হবে। অনুবাদঃ মুজিবুর রহমান।

[৮১:৭] যখন দেহের সঙ্গে আত্মাগুলোকে আবার জুড়ে দেয়া হবে। অনুবাদঃ তাইসিরুল কুরআন।

[৮১:৭] যখন আত্মাসমূহকে যুগল করা হবে। অনুবাদঃ মুহিউদ্দিন খান।

[৮১:৭] আর যখন আত্মাগুলোকে (সমগোত্রীয়দের সাথে) মিলিয়ে দেয়া হবে। অনুবাদঃ আল বায়ান ফাউণ্ডেশন। ছূরা তাকবীর আয়াত ১-৭।

আলোচনাঃ আল্লাহর কথায় ইহাই প্রমাণ হলো যে, “নফছ”, আত্মা বা প্রাণ আসবে কিয়ামতের সময়। কিন্তু বর্তমানে কবরে আল্লাহর আদেশ তথা “রূহ”, আত্মা বা প্রাণ দেয়ার কথা তো আল্লাহ ক্বুরআনের একটি আয়াতেও বলেননি।

কোনো দলীল প্রমাণ ছাড়াই যারা বলে কবরে মৃতো ব্যক্তিকে “রুহ” দিয়ে তার পর শাস্তি দেয়া হয় তাদের এই কথা ধোপে টেকে না। কারণ, দেহো তো মিশে যায় মাটির সাথে, মাছে খেয়ে ফেলে, আগুনে পুড়ে যায়, নদী ভাঙ্গনে কবর বিলিন হয়ে যায় এবং আল্লাহ বলেছেনঃ “অস্থিসমূহ জরাজীর্ণ অবস্থায় পচে গলে যায়”- ৩৬:৭৮। তাহলে বর্তমানে প্রাণহীন কবরে শাস্তি দেয়া হয় কিসের উপরে? কে শাস্তি দেয়? প্রমাণ কি? ক্বুরআন অস্বীকারকারীরা আমার এই কথাগুলোর কোনো যুক্তি বা প্রমাণ দিতে পারবে কি? তবে তারা শুধু অহংকার করতে পারে।

মূল কথা হলো আল্লাহ কিয়ামতের সময় যখন বলবেন “কুন” হয়ে যাও “ফা’ইয়াকুন” অমনি আল্লাহর আদেশে মানুষের দেহসহ সব কিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে যাবে। দেহো তৈরির পর যখন নফস/ প্রাণ/ আত্মাগুলোকে ছেড়ে দেয়া হবে তখনই আত্মাগুলো দেহের মধ্যে প্রবেশ করবে। তবে যারা বলে প্রাণহীন দেহে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রাণহীন দেহে কবরে শাস্তি দেয়া হয় তাদের মধ্যে ভাবনা-চিন্তার অভাব রয়েছে।

(০৬) উপোরক্ত আয়াত ও যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো আযাব নাই।

আত্মা দেহে আসার পর তারা ভীত সন্ত্রস্থ হবে, কেউ কারো দিকে তাকানোর সুযোগ পাবে না, নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ছুটতে থাকবে এবং বিচারের মুখোমুখি করে তাকে প্রতিদান দেয়া হবে, এবং সঠিক ভাবেই সে প্রতিদান পাবে। এ প্রতিদান বিচারের আগে নয় বরং বিচারের পরে।

সিঙ্গায় ফুক দেয়া, কে ঘুম থেকে উঠালো?

কে আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগালো? এর অর্থ আমি যা বুঝি তা হচ্ছে আমল নামা ইল্লিয়্যীনে এবং ছিজ্জীনে চলে যাবার পর কিয়ামতের সময় তাদের “নফছ”/ আত্মা/ প্রাণ ছেরে দিলে দেহ তৈরি হয়ে দেহের মধ্যে আত্মা প্রবেশ করলে বিবেক জাগ্রত হবে এবং তারা মনে করবে যে, আমরা তো এতদিন নিষ্ক্রিয় তথা ঘুমের মধ্যে ছিলাম। কে আমাদেরকে জাগ্রত করলো। দেহের সাথে আত্মা সংযোজন হলে তারা ঐ কথা বলে পঙ্গপালের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে রবের নিকট যেতে থাকবে। এখানে কবর বলা হয়েছে এই জন্য যে, মৃতো দেহোকে কবরে রাখা হয়। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করে মৃতো মানুষের দেহ কাক দ্বারা কবরস্থ করার নিয়ম দেখিয়েছেন বলেই আল্লাহ কবরের কথা বলছেন। কবর শব্দটি আভিধানিক অর্থে ব্যবহার হয়েছে। আসলে কবর বলতে নফছ ছেরে দিলে সেদিন সমস্ত মানুষ মাটি থেকেই উঠবে।

[৩৬:৫১] (আল্লাহ বলেন) সিঙ্গায় ফুকদিলে সকলে কবর থেকে বের হয়ে রবের নিকট ছুটে চলবে। ছূরা ইয়াছীন আয়াত ৫১।

[৩৬:৫২] তারা বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভোগ! আমাদেরকে আমাদের ঘুমের জায়গা থেকে কে উঠালো? (তাদেরকে জবাব দেয়া হবে) ‘‘এটা হলো তাই- দয়াময় আল্লাহ যার ওয়াদা দিয়েছিলেন, আর রছূলগণ সত্য কথাই বলেছিলেন। ছূরা ইয়াছীন আয়াত ৫২। অনুবাদঃ তাইসিরুল কুরআন।

আলোচনাঃ এই আয়াতের ভিত্তিতে কিয়ামত পর্যন্ত এক ঘুমে থাকা মানুষগুলো কিভাবে আযাব বা শাস্তি ভোগ করতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়। কাউকে শস্তি দিলে সে কি ঘুমের মধ্যে থাকতে পারে? শাস্তি দিলে তো সঙ্গে সঙ্গে তার ঘুম ভেঙ্গে যেতো। আচ্ছা বলুন তো! ঘুমের মধ্যে কি কাউকে শাস্তি দেয়া যায়? এই পৃথিবীর কোনো জ্ঞানবান ব্যক্তি কি এই কথা বিশ্বাস করতে পারে? মানুষ তো দুরের কথা, কোনো প্রাণীকেও ঘুমের মধ্যে শাস্তি দেয়া যায় কি? ইহা অযুক্তিক কথা ছাড়া আর কিছুই কি হতে পারে? যারা বলে কবরে শাস্তি দেয়া হয় তারা যে কতোবড়ো ভুলের মধ্যে আছে তা আল্লাহই মা’লুম।

(০৭) এই একটি যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

উপরের আয়াতে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যনীয়ঃ যখন কবরবাসিকে আত্মা দেয়া হবে তখন কবরবাসি আফসোস করে বলে উঠবে যে, “কে আমাদেরকে নিদ্রা থেকে জাগালো”? এর কারণ, মৃতো ব্যক্তির দেহের সাথে আল্লাহর আদেশ তথা রূহ বা আত্মা না থাকাতে হটাৎ আল্লাহর আদেশে সে জীবিতো হলে তখন তার কাছে মনে হবে যে, সে অনেক দিন ঘুমিয়েই ছিলো। তাই সে বলে উঠবে “কে আমাকে ঘুম থেকে জাগালো”? যেমন, আল্লাহ বলেছেন, মানুষ ঘুমের মধ্যেও মৃতো- ৩৯:৪২। তাই আছহাবে কাহাফের যুবকরাও কয়েক বছর পর জীবিত হয়ে বা ঘুম থেকে উঠে বলেছিলো যে, তারা সেখানে একদিন বা দিনের কিছু সময় অবস্থান করেছিলো মাত্র, এটা তাদের কাছে মনে হয়েছিলো।

জানার বিষয় হলোঃ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াতে কবরবাসীর দুর্ভোগ বেড়ে গেলো। তাহলে এতোদিন কবরে তারা আরামেই ছিলো। শাস্তি দিলে তো তারা আগে থেকেই দুর্ভোগে থাকতো, তাই নয় কি? যারা বলে কবরে আযাব দেয়া হয়, তাদের কথায় বোঝা যায় যে, আযাব হবে খুব স্বাদের আযাব, আরামের আযাব, মজাদার আযাব বা খুব মধুর আযাব। কারণ, ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার কারণেই যদি তাদের দুর্ভো বেড়ে যায় তাহলে এর আগে তারা যে আযাবের মধ্যে ছিলো তা নিশ্চয় তাদের জন্য আরামদায়ক আযাব ছিলো। তাহলে আযাবও আরামদায়ক তাই নয় কি? আর এতো স্বাদের আযাব যা কবরবাসীকে নিদ্রাবস্থায় দেয়া হয় যা তারা টেরও পায় না জানতেও পারে না। তাদের মধ্যে নূন্যতম জ্ঞান থাকলেও তারা কবর আযাবের ওয়াজ করতে পারতো না।

(০৮) উপোরক্ত আল্লাহর এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই তাই তারা কোনো দুর্ভোগেই থাকে না।

কিছু আযাব দিলেই বলে উঠবে

[২১:৪৬] আপনার পালনকর্তার আযাবের কিছুমাত্রও তাদেরকে স্পর্শ করলে তারা বলতে থাকবে, হায় আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা অবশ্যই পাপী ছিলাম। ছূরা আম্বিয়া আয়াত ৪৬।

আলোচনাঃ এই আয়াতের “ছিলাম” শব্দ দ্বারা অতিতকাল বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ বললেন যে, আযাব থেকে যদি কিছু আযাব দেই তাহলেই তারা বলে উঠবে যে, আমরা পাপী ছিলাম। কবরে যদি আযাব দেয়া হতো তাহলে তারাও ঐভাবে বলে উঠতো যে, “হায় আমাদের দুর্ভোগ, আমরা পাপী ছিলাম যার কারণে আমাদেরকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে”। কিন্তু কবরবাসী কবরের আযাব পেয়েও কি এরুপ কোনো মন্তব্য করেন? এরুপ মন্তব্যের কথা কি আল্লাহ ক্বুরআনে বলেছেন? অর্থাৎ কবরে আযাব হলে কি তারা এমন মন্তব্য করতো না যে, আমরা পাপী ছিলাম? আর আল্লাহ কি তা আমাদেরকে জানাতেন না?

(০৯) এই যুক্তি দ্বারাই তো প্রমাণ হয় যে, কবরবাসীর কোনো শাস্তি নাই তাই তারা কিছু বলেও না।

সেদিন পরিমান মতো প্রতিদান দেয়া হবে

[৩৬:৫৪] (আল্লাহ বলেন) অতপরঃ (ঘোষণা হবে) আজ কারোও প্রতি (বিন্দু মাত্র) যুলুম করা হবে না, (আজ) তোমাদের শুধু সেটুকু প্রতিদান দেয়া হবে যা তোমরা দুনিয়াতে করে এসেছো। ছূরা ইয়াছীন আয়াত ৫৪।

আলোচনাঃ লক্ষ্য করেছেন কি? সেদিনই পরিমান মতো প্রতিদান দেয়া হবে। আল্লাহ বলেছেন “আজ”, এবং বলেছেন “পরিমাণ মতো” এবং বলেছেন “জুলুম করা হবে না”। আবার লক্ষ্য করুন! আল্লাহ বলেছেন “আজ”, “পরিমাণ মতো”, এবং বলেছেন “জুলুম করা হবে না”। আল্লাহর কথা অনুযায়ী “আজ” অর্থাৎ সেই দিন আসার পূর্বেই কি আল্লাহ কাউকে তার প্রাপ্যের পরিমাণ দিয়ে শাস্তি দিতে পারেন? সেই দিন আসার আগেই যদি কাউকে শাস্তি দেয়া হয় তাহলে তা কি তার প্রতি জুলুম করা হলো না? তাহলে আল্লাহ কি দুই রকম কথা বলেন? (মা’আজাল্লাহ)।

(১০) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই?

সেদিন অপরাধ জানিয়ে দেওয়া হবে

[৫৮:৬] (আল্লাহ বললেন) যে দিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুজ্জীবিত করে উঠাবেন অতঃপর তারা যে আমল করেছিলো তা তাদেরকে জানিয়ে দেবেন। আল্লাহ তা হিসাব করে রেখেছেন যদিও তারা তা ভুলে গেছে। আর আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী। ছূরা মুজাদালা আয়াত ৬।

[২৪:২৪] যেদিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত, তাদের পা- তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে। ছূরা নূর আয়াত ২৪।

[২৪:২৫] আল্লাহ সেদিন তাদেরকে তাদের ন্যায্য পাওনা পুরোপুরিই দেবেন আর তারা জানতে পারবে যে, আল্লাহই সত্য স্পষ্ট ব্যক্তকারী। ছূরা নূর আয়াত ২৫।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেনঃ (১) কিয়ামতে তাদের অপরাধের কথাগুলো তাদেরকে জানিয়ে দেবেন। প্রশ্নঃ কবরে জানার কথা আল্লাহ ক্বুরআনে বলেছেন কি? (২) তাদের হাত, পা, জিহবা তাদের বিরুধ্যে সাক্ষ্য দিবে। প্রশ্নঃ কবরে হাত-পা সাক্ষ্য দেয়ার কথা আল্লাহ ক্বুরআনে বলেছেন কি? (৩) আল্লাহ আরও বললেন যে, সেদিন তাদেরকে ন্যায্য পাওনা পুরোপুরিই মিটিয়ে দিবেন। প্রশ্নঃ তাহলে কাউকে তার অপরাধের কথা না জানিয়ে তার হিসাব তাকে না দেখিয়ে এবং ন্যায্য পাওনা না দিয়ে আগেই কাউকে শাস্তি দেয়া যায় কি? এটা পৃথবীর কোনো বিচারক মেনে নেবেন কি? কোনো মানুষ মেনে নিবেন কি?

(১১) এই তিনটি আয়াতের যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই?

তখন তারা জানতে পারবে

[১৯:৭৫] বলো, যারা গুমরাহীতে পড়ে আছে, দয়াময় তাদের জন্য (রশি) ঢিল দিয়ে রাখেন, যে পর্যন্ত না তারা দেখতে পাবে যার ওয়া‘দা তাদেরকে দেয়া হয়েছে- তা শাস্তিই হোক কিংবা ক্বিয়ামতই হোক।’ তখন তারা জানতে পারবে মর্যাদায় কে নিকৃষ্ট আর কে জনবলে দুর্বল। ছূরা মার’ইয়াম আয়াত ৭৫।

আলোচনাঃ যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছে, এই ওয়াদা হচ্ছে “কিয়ামত”। কিয়াময়াত হউক বা শাস্তি হউক যাই হউক তা সেদিনই জানতে পারবে। সেদিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন। অর্থাৎ কবরের সময় শেষ হলেই তা জানতে পারবে অর্থাৎ কবরে সে কিছুই জানবে না। আর যে জানে না তাকে শাস্তি দেয়াও যায় না।

(১২) এই যুক্তি দ্বারাই তো প্রমাণ হয় যে, কবরে সে কিছু জানে না তাই তার কোনো শাস্তিও হয় না।

বিচারের আগে জাহান্নাম সামনে আনা হবে

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন, সকল মানুষকে একত্রিত করে শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নামকে সামনে আনা হবে, আল্লাহর এই কথাকে উপেক্ষা করে যারা বলে কবর থেকেই শাস্তি শুরু হয়ে যায়, যারা আল্লাহর সত্য বাণী মানে না, যারা মানুষের বানানো বাণী আল্লাহর বাণীর সাথে সংযুক্ত করে, কবরে আযাব না থাকা সত্বেও কবর আযাবের মতো মিথ্যা বিধান দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে ও ধোঁকা দেয়, মিথ্যা কথা শুনিয়ে আল্লাহর সত্য বিধান প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাদের জন্য হুসিয়ারী বাক্য উচ্চারণ করলেন। আল্লাহ বলেন-

[১৮:৯৯-১০০]…অতঃপর আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করবো। আর সেদিন আমি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের নিকট জাহান্নামকে সরাসরি উপস্থিত করবো। ছূরা কাহাফ আয়াত ৯৯-১০০। জান্নাতকেও সামনে আনা হবে- ৮১:১৩।

আলোচনাঃ শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নাম সামনে আনা হবে, কবরে শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নাম সামনে আনা হবে কি? এমন কথা আল্লাহ ক্বুরআনে বলেছেন কি?

(১৩) এই আয়াত দ্বারাও কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই?


যারা কবরের আযাব বিশ্বাষ করে তারা মুখে মুখে ক্বুরআন মানলেও মূলোতো তারা কুরআনের আয়াত বাদ দিয়ে নিজেদের বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে থাকে। যে আযাবের নাম গন্ধও ক্বুরআনে নাই সে বিষয় আলোচনা করাও উচিৎ না। কারণ, ক্বুরআনে আল্লাহ কবরের আযাব বিষয়ক একটি আয়াতও নাজিল করেননি। কিন্তু হাদীছের কিতাবগুলোতে কবরের আযাব সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা থাকাতে বার্যাখ নিয়ে কিছু আলোচনার প্রয়োজন হয়েছে।


কবর আযাব ক্বুরআনে নাই কেনো?

আমরা কবরের ভয়াবহ ‘আযাব সম্পর্কে ওয়াজ নছিহাত শুনি। যদি কবরে আযাব থাকে তাহলে এই ভয়াবহ আযাব বা এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আল ক্বুরআনে এর বর্ণনা উল্লেখ নাই কেনো? আল্লাহ কি এ বিষয় বলতে ভুলে গেছেন? মা’আ’জাল্লাহ। সমাজে কবরের আযাব সম্পর্কে অসংখ্য জাল হাদীছ, দুর্বল হাদীছ, যঈফ হাদীছ, বানোয়াট হাদীছ ও মিথ্যা হাদীছ চালু রয়েছে। কুরআন হলো ইসলামী জ্ঞানের একমাত্র নির্ভূল উৎস ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তাই আসুন, আলোচ্য বিষয়টি কুরআনের সাথে মিলিয়ে এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

প্রথম সৃষ্টি এবং আলাছতু বিরব্বিকুম

জেনে রাখা ভালো যে, আমরা পৃথিবীতে আসার পূর্বে কোনো নমুনা ছাড়াই এবং অস্তিত্বহীন থেকে আল্লাহ আমাদেরকে প্রথম সৃষ্টি করেছিলেন। আল্লাহ বলেন-

[১৯:৬৭] মানুষ কি স্মরণ করেনা যে, আমি তাকে ইতি পূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিলো না? ছূরা মার’ইয়াম আয়াত ৬৭।

আলোচনাঃ প্রথম সৃষ্টির পর আমরা আল্লাহর সঙ্গে যে ওয়াদা করেছিলাম, যখন বিচার দিবসে আমরা পুনরায় আল্লাহর সামনে সারিবদ্ধভাবে দাড়াবো তখন সেই ওয়াদার কথা আল্লাহ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন। আল্লাহ বলেন-

[১৮:৪৮] আর তাদেরকে তোমার রবের নিকট উপস্থিত করা হবে সারিবদ্ধভাবে এবং বলা হবেঃ তোমাদেরকে প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হয়েছ…। ছূরা কাহাফ আয়াত ৪৮।

[৬:৯৪] (ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ বলবেন) তোমরা আমার নিকট তেমনই নিঃসঙ্গ অবস্থায় হাজির হয়েছো যেমনিভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম…। ছূরা আন’আম আয়াত ৯৪।

[১০:৪] তোমাদের সকলকে তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, নিশ্চয় তিনিই প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই পুনর্বার সৃষ্টি করবেন…। ছূরা ইঊনুছ আয়াত ৪।

[৭:১৭২] আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব বনী-আদমের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের বংশধরকে বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজদের উপর সাক্ষী করলেন যে, ‘আমি কি তোমাদের রব নই’? তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম। (আল্লাহ বলেছিলেন) যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। ছূরা আ’রাফ আয়াত ১৭২।

আলোচনাঃ আল্লাহর সাথে ওয়াদা করা, নবীগণকে সাহায্য করা, পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করার ওয়াদা সত্বেও মুনাফেকরা নবীর কাছ থেকে পালিয়ে যায়- ৩৩:১৪। মানুষ পৃথিবীতে এসে সে ওয়াদার কথা ভুলে যাওয়াতে কিয়ামতে অবশ্যই সেই পূর্বের ওয়াদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। আল্লাহ বলেন-

[৩৩:১৫] অথচ তারা ইতোপূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে। ছূরা আহযাব আয়াত ১৫।

আলোচনাঃ এ পৃথিবীতে যতো মানুষ আসছে এবং আসবে তাদের সকলকে আগেই তৈরি করে আল্লাহ সকলের অঙ্গিকার নিয়েছিলেন। আল্লাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন “আলাছতু বিরব্বিকুম” “আমি কি তোমাদের রব নই”? আমরা সেদিন সাক্ষ্য দিয়েছিলাম যে, ‘হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব। আল্লাহ তখন বলেছিলেন এ বিষয়টি এ জন্য যে, “যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিলো না”। আমরা আরও ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলাম যে, পৃথিবীতে এসে আমরা পৃষ্টপ্রদর্শন করবো না অর্থাৎ আল্লাহর কোনো আদেশই অমান্য করবো না এবং নবীগনের কিতাব মান্য করবো ও নবীগণকে সাহায্য করার ওয়াদাও করেছিলাম- ৩:৮১। তদ্রুপ মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করার পর আমরা সকলেই সেই কিয়ামতের দিন আবার আল্লাহর সামনে সারিবদ্ধভাবে দ্বাড়াবো এবং প্রথমবার সৃষ্টি করার পর আল্লাহর সাথে যে ওয়াদা করেছিলাম তাও আমাদের মনে পরে যাবে, এবং মনে পরে যাবে আল্লাহর সাথে সেই ওয়াদার কথাও।

১০ দিন, ১ দিন, দিনের কিছু অংশ

নিচের এই বিষয়টি ধীরে ধীরে মন দিয়ে পড়ুন আর বুঝুন। মানুষ পৃথিবীতে যতোদিন জীবিত থাকবে ততোদিনের একটা ধারনা করে বা অনুমান করে কেয়ামতের দিন বলবে যে, আমরা ১০ দিন, ১ দিন বা দিনের কিছু সময় পৃথিবীতে ছিলাম। অর্থাৎ কেউ শতো বছরের বেশি, কেউ ৬০ বছর আবার কেউ ৩০/২০ বছর বেচে থাকে বা তার আগেই মারা যায়। মানুষ পৃথিবীতে যতোদিন জীবিতো থাকবে ততোদিনের কথাই তাদের মনে পড়বে। কবরে ছিলো মৃতো দেহো, তাদের প্রাণ কবরে ছিলো না, তাই কবরে সময়গুলোর কথা তারা বলবে না, বলতে পারবেও না, মানুষের কবর এই পৃথিবীতেই। কাজেই, যারা বলে কবরে আযাব হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ কবরসহ পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর থেকেও তারা কেনো বলবে যে, আমরা ১ দিন, বা দিনের কিছু সময় পৃথিবীতে ছিলাম?

(১৪) এই একটি যুক্তি দ্বারাই কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো আযাব নাই?

একশ বছর মৃতো ছিলো

আল্লাহ ছূরা বাক্বারার ২৫৯ নং আয়াতে বলেছেন যে, তিনি এক ব্যক্তিকে ১০০ বছর মৃতো অবস্থায় রেখে তাকে পুনরায় জীবিতো করার পর তাকে জিজ্ঞাসা করাতে সে বলল আমি এক দিন বা দিনের কিছু সময় এ অবস্থায় ছিলাম। ঐ ব্যক্তি ভেবে ছিলো যে, সকালে আমার মৃত্যু হয়েছিলো এবং বিকালেই আমি জীবিতো হলাম। তদ্রুপ আছহাবে কাহাফের যুবকদের ব্যপারও।

আছহাবে কাহাফ

আল্লাহ ছূরা ঝুমারের ৪২ নং আয়াতে বলেছেন যে, মানুষ ঘুমের মধ্যেও মৃতো। উক্ত আয়াতে প্রমাণ হলো যে, পৃথিবীর সকল মানুষ ঘুমের মধ্যে মৃতো থাকে। তদ্রুপ আছহাবে কাহাফের যুবকরা কোনো শাস্তি ছাড়াই কয়েক বছর মৃতো অবস্থায় ঘুমের মধ্যে ছিলো- ১৮:১১+২৬। যুবকরা কয়েক বছর ঘুমের মধ্যে কাটিয়ে জাগ্রত হওয়ার পর তাদের কেউ বললোঃ তারা এক দিন বা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছিলো- ১৮:১৯। অর্থাৎ তারা কোনো শাস্তির মধ্যে ছিলো না, তাই তাদের কাছে মনে হয়েছিলো যে, মাত্র দিনের কিছু অংশ তারা ঘুমিয়ে ছিলো। যদি তারা কোনো শাস্তির মধ্যে থাকতো তাহলে তাদের মনে থাকতো এবং তারা বিরামহীনভাবে এক নিয়মে ঘুমের মধ্যে থাকতে পারতো না। যদি তারা শাস্তি অবস্থায় থাকতো তাহলে তা তাদের মনে থাকার কারণে তারা একদিনের কথা বলতো না। তাহলে তারা বলতো যে, আমরা বহু বছর অবস্থান করেছি।

আছহাবে কাহাফের এই ঘটনায় আল্লাহ কিয়ামত ও কিয়ামতের ওয়াদা যে সত্য তা বুঝিয়েছেন- ১৮:২১। তদ্রুপ কিয়ামতের দিনেও মানুষ সেই আছহাবে কাহাফ গূহাবাসীদের মতোই বলবে যে, আমরা ১০ দিন/ ১ দিন/ দিনের কিছু অংশ পৃথিবীতে অবস্থান করে ছিলাম। আছহাবে কাহাফের এ বিষটি এখানে টানার কারণ এই জন্য যে, যুবকরা যেমন শাস্তি ছাড়া ঘুমের মধ্যে মৃতো অবস্থায় কাটিয়েছে তাই তাদের মনে হয়েছিলো যে, আমরা সকালে ঘুমিয়ে বিকালে উঠলাম তাই তারা বলেছিলো একদিনের কথা। ঠিক তদ্রুপ, কবরবাসিরাও শাস্তি ছাড়া মৃতো অবস্থায় ঘুমের মধ্যে থাকে, যার কারণে মৃতো অবস্থায় থাকার সময়গুলো তাদের জানা থাকবে না। তারা পৃথিবীতে যতোদিন জীবিতো ছিলো ততো দিনের কিছু তাদের মনে পরবে। তাই তারা একটা ধারনা করে বলবে যে, আমরা পৃথিবীতে ১০ দিন/ ১ দিন বা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছিলাম। আল্লাহ বলেন-

[২০:১০৩-১০৪] (কিয়ামতের দিন) সেদিন তারা নিজেদের মধ্যে চুপি চুপি বলাবলি করবেঃ তোমরা (পৃথিবীতে) মাত্র দশ দিন অবস্থান করেছিলে। তারা কি বলবে তা আমি ভালো জানি। তাদের মধ্যে যে অপেক্ষাকৃত সৎপথে ছিলো সে বলবেঃ তোমরা এক দিনের বেশি অবস্থান করনি। ছূরা ত্বহা আয়াত ১০৩-১০৪।

আলোচনাঃ উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে তারা কেয়ামতের দিন বলাবলি করবে যে, তোমরা মাত্র ১০ দিন বা একদিন পৃথিবীতে অবস্থান করেছিলে, যদি তারা আছহাবে কাহাফের যুবকদের মতো শাস্তি ছাড়া নিরাপদে না থাকতো তাহলে কিয়ামতে পৃথিবীতে জীবিত থাকার ১০ দিন বা একদিনের কথা বলতে পারবে না। কারণ, তাদেরকে শাস্তি দেয়া হলে তারা জাগ্রত থাকতো। আর জাগ্রত থাকলে একদিন দশদিন বলার সুযোগ থাকতো না। কারণ, তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে কবরে শাস্তিসহ কিয়ামত পর্যন্ত হাজার জাজার দিনের কথা মনে পরতো আর বলতো আমরা বহু বছর/ হাজার বছর পৃথিবীতে ছিলাম। অর্থাৎ কবরবাসিকে কবরে শাস্তি দেয়া হলে তা তাদের মনে থাকতো, তাই তারা কিয়মতে বলতো আমরা পৃথিবীতে বহু বছর বা হাজার বছর ছিলাম, কিন্তু সেইদিন তারা তা বলবে না।

(১৫) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।


১ দিন বা দিনের কিছু অংশ

[২৩:১১৩] (আল্লাহ বলেনঃ কিয়ামতে) তারা বলবে, আমরা একদিন বা এক দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি। না হয় আপনি গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞেস করুন। ছূরা মু’মিনূন আয়াত ১১৩। (গণনাকারী দুইজন ফেরেস্তা যথা কেরামান কাতেবীন- ৮২:১১)।

এক সন্ধ্যা বা এক সকাল ছিলো

[৭৯:৪৬] যেদিন তারা একে দেখবে, সেদিন মনে হবে যেনো তারা দুনিয়াতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছে। ছূরা নাজিয়াত আয়াত ৪৬।

মুহূর্তকাল 

[৩০:৫৫] যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন অন্যায়কারীরা কসম করে বলবে যে, তারা মূহূর্তকালের বেশি অবস্থান করেনি। এভাবেই তারা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হতো।

আলোচনাঃ আল্লাহ ৭৯:৪৬ আয়াতে বললেন যে, তাদের “মনে হবে”। এবং ৩০:৫৫ আয়াতে বলেছেন মুহূর্তঃ অর্থ “চোখের পলক/ অল্পক্ষণ/ নিমিষ/ অতি সামান্য সময়”। অর্থাৎ অপরাধীরা আল্লাহকে বুঝাইতে চাইবে যে, আমরা মুহূর্তকাল বা সামান্য সময় পৃথিবীতে ছিলাম কাজেই, আমরা অপরাধ করার সময়ই পাইনি। আল্লাহ সে জন্যই বললেন যে, “এভাবেই তারা সত্য থেকে বিমুখ থাকতো”। অর্থাৎ তারা পৃথিবীতেও এভাবে সত্যবিমুখ ছিলো।

সামান্য সময় ছিলে

[১৭:৫২] যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাকবেন আর তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে তাঁর ডাকে সাড়া দিবে আর তোমরা ধারণা করবে/ মনে করবে/ অনুমান করবে যে, তোমরা সামান্য সময়ই (পৃথিবীতে) অবস্থান করেছিলে। ছূরা বনি ইছরাঈল আয়াত ৫২।

আলোচনঃ লক্ষ্য করুন! আল্লাহই বলে দিলেন যে, সেদিন মানুষ “ধারনা” করবে, যেমন ধারনা করেছিলো আছহাবে কাহাফের যুবকরাও। ক্বুরআন থেকে কোনো দলীল-প্রমাণ ছাড়া যারা বলেন কবরে দেহের মধ্যে “রূহ” দিয়ে দেহোকে শাস্তি দেয়া হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ “রূহ” দিলে তো সে জীবিত হয়ে যাবে, তাহলে হাজার হাজার বছর কবরে শাস্তি ভোগ করেও তারা কেনো বলবে যে, আমরা ১০ দিন/ ১ দিন অবস্থান করেছি, এটা কি হাস্যকর বিষয় নয়?

(১৬) এই যুক্তি দ্বারাই কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই?


তারা কেনো ধারনা করবে?

এবার আসুন তারা কেনো ধারনা করবে সে বিষয় একটু আলোচনা করি। অনেকেই মনে মনে ভাবতে পারেন যে, মানুষ পৃথিবীতে ৫০/৬০ বছরেরও কমবেশি বেচে থাকে, কিন্তু কিয়ামতে কেনো ধারনা করবে যে, ১০ দিন/ ১ দিন, দিনের কিছু অংশ বা সামান্য সময় পৃথিবীতে ছিলাম? ধারনা করার কারণ কি? আসলে “ধারনা” কথাটা সরাসরি আল্লাহ নিজেই বলেছেন। আমাদের একটি বিষয় মনে রাখা দরকার আর তা হলো আমরা এ পৃথিবীতে কেউ ২০, ৪০, ৮০, ১০০ বছরের বেশি ও কম বেচে থাকি। আবার এ পৃথিবীতে এমন মানুষ ছিলো যাদের জন্য আল্লাহ নির্ধারিত করেছিলেন ধীর্ঘায়ু- ২১:৪৪। আয়ুষ্কাল ধীর্ঘ ছিলো “নূহ নবীরও”। আল্লাহ তাঁকে ৫০ কম হাজার বছর বাচিয়ে রেখে ছিলেন- ২৯:১৪। সে অনুযায়ী কিয়ামতেও লোকেরা বলবে দিনের কিছু অংশ, ১ দিন আবার কেউ ১০ দিনের কথা বলবে। এর কারণটি লক্ষ্য করুন, আল্লাহ বলেন-

[৩২:৫] তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত কার্য পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উত্থিত হবে যার পরিমাপ তোমাদের গণনায় হাজার বছর।

আলোচনাঃ আল্লাহর গণনায় একদিনের সমান পৃথিবীর মানুষের গণনায় তা হাজার বছর- ৩২:৫। আমাদের দেশে সূর্য উঠলেও অন্য দেশে রাত অর্থাৎ সূর্য উঠে না। আল্লাহর আরশের ক্ষেত্রে এরকম অবস্থা হয় না। সেখানের পদ্ধতি আল্লাহই ভালো জানেন। পৃথবীর চেয়েও বড় কোটি কোটি নক্ষত্র আল্লাহ ঝুলিয়ে রেখেছেন যার আলো সূর্যের চেয়েও বেশি। কত দুরে তারপরও কিছু আলো দেখা যায়। আমরা আল্লাহর কাছে চলে যাওয়ার পর আল্লাহর গণনার হিসেবেই সেই সময় অতিবাহিত করবো, আমরা তা জানতেও পারবো। তাই সে গণনা অনুযায়ী আমাদের মনে হবে যে, আমরা পৃথিবীতে ১০ দিন/ একদিন/ একদিনের কিছু সময় পৃথিবীতে ছিলাম।

আমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করে আল্লাহ আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন “আলাছতু বিরব্বিকুম”, আমরা আল্লাহর এ প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছিলাম- ৭:১৭২। কাজেই প্রথমবার সৃষ্টিতে আমরা প্রথমে সেখানেই ছিলাম। পৃথিবীতে আসা অতঃপর পৃথিবী থেকে মৃত্যু হওয়ার পর আবার আমরা সেখানেই ফিরে গেলে সেখানকার অর্থাৎ আল্লাহর গণনার সেই হিসাবই আমরা করবো। সেখানের দিন অর্থাৎ বিচারের দিনও অনেক বড় হবে। যেমন, সেখানে কোনো বালক দাড়িয়ে থাকতে থাকতে বৃদ্ধ হয়ে যাবে- ৭৩:১৭। আর সেখানে তো বর্তমানের এই সূর্যটা সকাল-সন্ধ্যা উদয়-অস্ত যাওয়ার কথা আল্লাহ বলেননি।

নেকি বদি ওজন তার পর শাস্তি

[২৩:১০২-১০৩] (আল্লাহ বলেন, সেদিন) যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম, এবং যাদের পাল্লা হাল্কা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা জাহান্নামেই চিরকাল বসবাস করবে। ছূরা মু’মিনূন আয়াত ১০২-১০৩।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, সেদিন নেকি-বদি বা পাপ-পূণ্য ওজন করার পর যাদের পাল্লা ভারি হবে তারা সফল হবে অর্থাৎ জান্নাতে যাবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা চিরকাল বসবাসের জন্য জাহান্নামে থাকবে।

(১৭) আল্লাহর এই একটি কথায় প্রমাণ হয় যে, নেকি-বদি ওজনের পর থেকেই শাস্তি শুরু হবে, কবরে কোনো শাস্তি নাই। আল্লাহ নেকি-বদি ওজন না করে সেই আদম থেকে শুরু করে কিয়ামাত পর্যন্ত কাউকে হাজার হাজার বছর কবরে শাস্তি দিয়ে অবিচার করতে পারেন না, আল্লাহ অবিচারক নন।


প্রাণ হরণ মৃত্যুর সময়, কবরে রূহ দেয়া হয় না

[৩৯:৪২] (আল্লাহ বলেন) আল্লাহ মানুষের নফছ/ আত্মা/ প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে…। ছূরা ঝুমার আয়াত ৪২।

আলোচনাঃ এই আয়াতে প্রমাণ হলো যে, “নফছ” অর্থ “প্রাণ” বা “আত্মা”, এবং পরের আয়াতে কিয়ামতের সময় “নফছ” বা আত্মা ছেড়ে দেয়া হবে। আল্লাহ বলেন-

[৮১:৭] যখন দেহের সঙ্গে আত্মাগুলোকে আবার জুড়ে দেয়া হবে। ছূরা তাকবীর আয়াত ৭।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণ অর্থাৎ জান কবজ করা হয় এবং কিয়ামতের সময় দেহে প্রবেশের জন্য ঐ প্রাণগুলো ছেড়ে দেয়া হবে। কোনো দলীল প্রমাণ ছাড়া যারা বলেন কবরে পূনরায় “রুহ” দিয়ে তার পর কবরে আযাব দেয়া হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ কোন আয়াতের দলীলে আপনারা “রূহ” দেয়ার দাবী করেন? প্রমাণ কি? কিয়ামাত পর্যন্ত সময় নিলেও প্রমাণ দিতে পারবেন না। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম যে, কবরে “রূহ” দেয়া হয় তাহলে কবরের ঐ ব্যক্তির “রূহ” আবার কোন সময় হরণ করা হবে? অর্থাৎ কবরে যদি প্রাণ দেয়া হয় তাহলে তাকে পুনরায় জানকবজ করতে হবে তারপর কিয়ামতের সময় আবার প্রাণ দিয়ে জীবিতো করে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। নাকি ঐ প্রাণসহ কিয়ামতের সময় উঠে আসবে? নাকি আল্লাহর কথা অনুসারে কিয়ামতের আগ মুহুর্তে “আত্মাগুলো” ছেড়ে দিলে-৮১:৭ তখন দেহে প্রাণ প্রবেশ করবে, কোনটি?

(১৮) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে রূহ দেয়ার এই কথা ডাহা মিথ্যা? আর তাদের এই যুক্তি মিথ্যা হওয়ার কারণে তাদের কবর আযাবের দাবীও মিথ্যা। তাদের এই অযুক্তিক মিথ্যা তথ্যে আবারও প্রমাণ হলো যে, কবরে কোনো আযাব নাই এটাই মহা সত্য।


কবরসমূহ উম্মোচিত হলে প্রত্যেকে জানতে পারবে

[৮২:৪-৫] (আল্লাহ বলেন) এবং যখন কবরসমূহ উম্মোচিত হবে, তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে, সে যা আগে পাঠিয়েছে এবং যা পিছনে রেখে এসেছে। ছূরা ইনফিতার আয়াত ৪-৫।

আলোচনাঃ এই আয়াতে দুটি বিষয় লক্ষনীয়ঃ (১) “যখন কবর সমূহ উম্মেচিত হবে” অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথে মৃতো ব্যক্তির জন্য এই চেনা পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে অচেনা হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের আগ মুহুর্তে আত্মা ছেড়ে দিলে মানুষের জন্য পরকালের বাস্তবতা শুরু হবে। (২) “তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে”, অর্থাৎ মৃতো ব্যক্তির দেহে প্রাণ প্রবেশ করলে সে জীবিত হবে এবং পৃথিবীতে থাকাকালীন সে যা আমল বা কর্ম করেছিলো তা এবং কিয়ামত হওয়ার যে কথা ছিলো তাও সে জানতে পারবে। আল্লাহর কথায় প্রমাণ হলো যে, কবরসমূহ উম্মোচিত হওয়ার পরই প্রত্যেকে তার কর্মসহ সবকিছুই সে জানতে পারবে। আল্লাহর কথায় ইহাও প্রমাণ হলো যে, পুনরায় উঠার আগ পর্যন্ত মৃতো ব্যক্তির দেহো কবরে থাকাকালীন সময় কিছুই জানতে পারে না। 

(১৯) আল্লাহর এই একটি মাত্র কথা দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো প্রশ্ন নাই এবং কোনো আযাবও নাই। কবরে কিছু নাই বলেই সে কিছুই জানতে পারে না। যে কিছু জানতে পারে না, সে শাস্তি সম্পর্কেও কিছু জানতে পারে না, তাই কবরে কোনো প্রশ্নও নাই কোনো আযাবও নাই। আর সে জানবেই বা কি করে, সে তো জীবিতই না। আপনি না মানলে না মানতে পারেন কিন্তু আল্লাহর কথা অনুযায়ী এটাই মহা সত্য।


একত্রিত করবেন কাউকেই ছাড়বেন না

[১৮:৪৭] (আল্লাহ বলেন) (সেদিনের কথা চিন্তা করো) যেদিন আমি পাহাড়কে চলমান করবো এবং আপনি পৃথিবীকে দেখবেন একটি উম্মুক্ত প্রান্তর সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করবো অতঃপর তাদের কাউকেই ছাড়বো না। ছূরা কাহাফ আয়াত ৪৭।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন সেদিন তিনি কাউকে ছাড়বে না। অর্থাৎ ভালো মানুষ এবং মন্দ মানুষ উভয়কেই আল্লাহ বিচারের মুখোমুখি করবেন। আল্লাহ কি কবরে না ছাড়ার কথা বলেছেন নাকি সেদিন কাউকে ছাড়বেন না বলেছেন? কোনটি? আল্লাহ বললেন সেদিন তিনি কাউকে ছাড়বে না, যদি কবরে শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে তো সেদিন আসার পূর্বেই আল্লাহ কবরবাসিকে ধরে ফেললেন ও শাস্তি দিয়ে দিলেন। তাহলে আল্লাহ সেদিনের কথা বলে আবার কবরেও শাস্তি দেয়ার জন্য আক্রমণ করবেন তার মানে আল্লাহ কি দুই রকম কথা বলেন? (মা’আজাল্লাহ)।

(২০) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, সেদিন আসার পূর্বে আল্লাহ কবরে শাস্তি দেয়ার জন্য কাউকেই আক্রমণ করেন না?


কবর থেকে অপমান ও লাঞ্ছনা অবস্থায় উঠবে

[৫৪:৭] (আল্লাহ বলেন) (সেদিন) তারা অপমানে তাদের দৃষ্টি অবনত অবস্থায় কবর থেকে বের হয়ে আসবে। মনে হবে যেনো তারা বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল। ছূরা ক্বামার আয়াত ৭।

[৭০:৪৩-৪৪] (আল্লাহ বলেন) সেদিন তারা কবর হতে বের হবে দ্রুত বেগে। মনে হবে তারা কোনো একটি লক্ষ্যস্থলের দিকে ধাবিত হচ্ছে- তাদের দৃষ্টি হবে অবনমিত, লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। এটাই হলো সেই দিন যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিলো। ছূরা মা’আরিজ আয়াত ৪৩-৪৪।

আলোচনাঃ উপরের দুটি আয়াতে প্রমাণ হয় যে, আত্মা দেহে আসার পর সেদিন আল্লাহ মানুষকে একত্রিত করবেন এবং সেদিনই অপরাধী মানুষগুলোকে লাঞ্ছনা আচ্ছন্ন করবে। তারা অবনমিত হয়ে অপমান অবস্থায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থলের দিকে বা সমাবেশ স্থানের দিকে ছুটতে থাকবে, যেদিনের ওয়াদা আল্লাহ আগেই করেছেন। প্রশ্নঃ তারা কোন দিন অপমানীত হবে কবরে নাকি কিয়ামতে? কবরে শাস্তি দিলে সেকি অপমান হলো না? কবরে অপমানের কথা আল্লাহ বলেছেন কি? কবরে প্রশ্ন, কবরে শাস্তি, কবরে সাপ-বিচ্ছুর কামর, হাতুরী দিয়ে পিটানো ও দুইপাশের মাটি দ্বারা চাপ দেয়ার ওয়াদা আল্লাহ করেছেন কি? নাকি শাস্তির ব্যপারে সেদিনের ওয়াদা করেছেন?

(২১) এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে কিছুই হবে না, যা হবার সেই ওয়াদার দিনেই হবে।


আমার মৃত্যুই যদি শেষ হতো

কেয়ামতের ময়দানে মানুষ বিচার ও শাস্তির ভয় দেখে যা বলবে এবং আল্লাহ যা বলবেন-

[৬৯:২৫-২৭] কিন্তু যার ‘আমালনামা বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, ‘হায়! আমাকে যদি আমার ‘আমালনামা না দেয়া হতো, আর আমার হিসাব কী তা যদি আমি না-ই জানতাম, হায়! (দুনিয়ার) মৃত্যুই যদি আমার শেষ হতো! ছূরা হাক্কা আয়াত ২৫-২৭।

আলোচনাঃ অপরাধি মানুষ কিয়ামতে আফসোস করে বলবে যে, আমার মৃত্যুই যদি আমার শেষ হয়ে যেতো। (যারা বলে কবরে শাস্তি আছে তাদের ভাষায় বলি) মৃত্যু শেষ হওয়া অর্থাৎ তাকে যদি কবর থেকে আর না উঠানো হতো তাহলে সে শান্তিতে বেচে যেতো। এতেই বুঝা যায় যে, তার কবরে থাকাটা তার জন্য ভালই ছিলো। সে কবরে আযাবের মধ্যে থাকলে তো সে ভালো থাকতো না, কবরে আযাব থাকলে তার এমন মন্তব্য করার সুযোগও থাকতো না। কারণ, কবরেও শাস্তি এবং জাহান্নামেও শাস্তি, তাহলে সে কেনো বলবে যে, আমার মৃরত্যুই যদি শেষ হতো? এতেই বোঝা যায় যে, কবরে তার কোনো শাস্তিই ছিলো না তাই কিয়ামতে সে ঐ মন্তব্য পেশ করবে।

(২২) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।


[৭৮:৪০] (আল্লাহ বলেন) আমি তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলাম; সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে যা তার দু’হাত আগেই পাঠিয়েছে এবং কাফির বলতে থাকবেঃ হায়রে হতভাগা আমি! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!

আলোচনাঃ এই আয়াতে বলা হয়েছে “আমি তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলাম সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে যা তার দু’হাত আগেই পাঠিয়েছে”। এই আসন্ন শাস্তি কোনটি কবরে নাকি পরকালের শাস্তি। তাহলে কবর আযাব সম্পর্কে না বলে আল্লাহ কেনো সরাসরি পরকালের আসন্ন শাস্তির কথা বললেন? এর কারণ, কবরে কোনো শাস্তি নাই তাই কবর না বলে আল্লাহ সরাসরি পরকালের আসন্ন শাস্তির কথা বলেছেন।

(২৩) এই কথায় কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই?

এই আয়াতের আরও একটি বিষয় হলো, এই আয়াতটিও ৬৯:২৫-২৭ এর আয়াতের মতো, অর্থাৎ “কাফির ব্যক্তি বলতে থাকবেঃ হায়রে হতভাগা আমি! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!” কেনো কাফের ব্যক্তি মাটি হতে চাইবে? কবরে যদি শাস্তি হতো তাহলে সেতো কবরের আযাবের ভয়ে তখনও বলতো যে, “যদি আমি মাটি হয়ে যেতাম” কিন্তু কবরে মৃতো ব্যক্তি কি ঐরূপ মন্তব্য করেছেন? করেননি। যদি করতেন তাহলে আল্লাহ সে কথাও আমাদেরকে জানিয়ে দিতেন যেরুপ জানিয়েছেন ৭৮:৪০ আয়াতে।

(২৪) এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো সাস্তি নাই।


পুনরায় দুনিয়াতে পাঠাও

[২৩:৯৯] (আল্লাহ বলেন) এমনকি যখন তাদের কারো কাছে মৃত্যু এসে হাজির হয় তখন সে বলে : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আবার প্রেরণ করো। ছূরা মু’মিনূন আয়াত ৯৯।

আলোচনঃ এখন আল্লাহকে কেউ রব/ প্রতিপালক বলে না কিন্তু তখন ঠিকই বলবে। লক্ষ্য করুন! মৃত্যুর সময় দুনিয়াতে পাঠাতে বলবে। কবরের আযাব শুরু হলে দুনিয়াতে পঠাতে বলবে না। কারণ, মানুষ বিচার দিবস, জাহান্নাম ও ফেরেস্তার কথা শুনলেও তা বাস্তবে কোনোদিন চোখে দেখেনি এবং অনেকে বিশ্বাসও করে না। কিন্তু মৃত্যুর সময় যখনই সে জান কবজকারী ফেরেস্তাগণকে দেখবে তখনই সে মনে করবে যে সবই তো সত্য। তাই আত্মা বের হওয়ার আগেই সে বলে উঠবে আমাকে আরও কিছুকাল সময় দাও সৎকর্ম করবো যা আমি আগে করেনি। যেমন আল্লাহ বলেন-

[৬৩:১০] আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো, অন্যথায় সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। ছূরা মুনাফিক্বূন আয়াত ১০।

আলোচনঃ মৃত্যুর সময় পুনরায় পৃথিবীতে পাঠাতে বলবে। কিন্তু কবরে শাস্তি থাকলে তো সেই শাস্তি দেখেই মৃতো ব্যক্তির বলার কথা ছিলো যে, আমাকে পুনরায় পৃথিবীতে পাঠাও।

(২৫) এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে শাস্তি নাই তাই সে কবরের আযাবের সময় পৃথিবীতে পাঠাতেও বলবে না। যদি বলতেন তাহলে আল্লাহ তা আমাদেরকে জানিয়ে দিতেন।


মৌলভীরা ক্বুরআন দ্বারা কবর আযাবের ওয়াজ করে না কেনো?

মৌলভীরা ক্বুরআন দ্বারা কবর আযাবের কোনো ওয়াজ করতে পারে না। কারণ, কবর আযাবের কথা আল্লাহ ক্বুরআনের একটি আয়াতেও বলেননি। তাই মৌলভীরা কবর আযাব শুনানোর জন্য মিথ্যা হাদীছ, যঈফ হাদীছ ও জাল হাদীছগুলোই বেচে নিয়ে তা দ্বারাই কবর আযাবের ওয়াজ করে। তারা মানুষকে কবর আযাবের ভয় দেখিয়ে, কবরে ৯৯ টি সাপের ভয় দেখিয়ে, মৃতো ব্যক্তির নামে কুল খনি করে, ৪ দিন্না, ৪০ দিন্না, ফাতেহা, ক্বুরআন খতম, দোয়া দরুদ ও মিলাদ পড়িয়ে মানুষের পকেটের টাকা হাতিয়ে নেয়। ক্বুরআনের জ্ঞান না থাকাতে সাধারণ মানুষ তাদেরকে টাকা পয়সা দিয়েও থাকে। মোল্লা, মৌলভী, হুজুররা কোনো উপায় না পেয়েই এটা করে থাকে। কারণ, তাদের জেনারেল শিক্ষার কোনো সার্টিফিকেট না থাকায় সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায় না, কোনো অফিস-আদালতে চাকরি হয় না, কোনো কাজ-কার্ম শিখানো হয়নি বলে তাই বড় হয়ে যখন টাকার প্রয়োজন হয় তখন সে নিরুপায় হয়ে অন্যদের মতো ইছলামকে পুঁজি করে পর নির্ভর্শীল হয়ে চলতে থাকে। মৌলভীরা ক্বুরআন দ্বারা কবর আযাবের ওয়াজ করতে পারে না, ইহা দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই তাই তারা ক্বুরআন দ্বারা ওয়াজও করতে পারে না?

(২৭) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো আযাব নাই এবং কবরে কোনো প্রশ্নও নাই।


শাস্তি কবরে নয়, দহন-যন্ত্রণার শাস্তি কিয়ামতে

[২২:৭-১০] (আল্লাহ বলেন) (কিয়ামতের দিন আমি তাকে দহন-যন্ত্রণা ভোগ করাবো)। ছূরা হজ্জ আয়াত ৭-১০।

আলোচনাঃ আল্লাহর কথায় কি প্রমাণ হলো? শাস্তি কি কিয়ামতের বিচারের পরে নাকি বিচারের আগে? কিয়ামতের আগে বা কবরে কোনো শাস্তির কথা আল্লাহ কুরআনে বলছেন কি?

(২৮) আল্লাহর এই কথা দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, শাস্তি কবরে নয়, শাস্তি কিয়ামতে?


সেদিনই শাস্তি দেয়া হবে

[৪৬:২০] (আল্লাহ বলেন) (সেদিন জাহান্নামের কাছে নিয়ে বলাহবে আজ তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে)- ছূরা আহকাফ আয়াত ২০।

আলোচনঃ লক্ষ্য করুন! এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, “আজ তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে”। যেসমস্ত ক্বুরআন অস্বীকারকারীরা বলে যে, কবরে শাস্তি দেয়া হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ আজ শাস্তি দিলে কবরে হাজার হাজার বছর কি দেয়া হয়েছে? এই আয়াতের “আজ” শব্দটি লক্ষ্য করুন! আল্লাহ কিয়ামতের দিন কাফেরদেরকে বলবেন যে, “”আজ তোমাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে””। কাজেই শাস্তি সেদিনই দেয়া হবে, সেদিন আসার আগে কবরে কোনো শাস্তির কথা আল্লাহ বলেননি। যারা বলে কবরে শাস্তি দেয়া হয় তারা আল্লাহর এই কথা বিশ্বাস করে না। যারা বলে কবরে শাস্তি দেয়া হয় তাদের কথার অর্থ দ্বাড়ায় তারা আল্লাহর চেয়েও বেশি জানে। (মা’আজাল্লাহ)।

(২৯) এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই। জাহান্নামের কাছে নিয়েই শাস্তির কথা বলা হবে।


[৬৯:৩০-৩১] (আল্লাহ বলেন) (তখন নির্দেশ আসবে) ধর ওকে, ওর গলায় ফাঁস লাগিয়ে দাও/ বেড়ি পড়িয়ে দাও, অতঃপর তাকে নিক্ষেপ করো জাহান্নামে। ছূরা হাক্কা আয়াত ৩০-৩১।

[৬৯:৩২] (পুনরায়) ওকে শিকল দিয়ে বাঁধো- সত্তর হাত দীর্ঘ এক শিকলে। ছূরা হাক্কা আয়াত ৩২।

আলোচনাঃ কবরে দুই পাশের মাটি দ্বারা চাপ দিয়ে শাস্তি নয়, সাপ-বিচ্ছুর কামর দ্বারা শাস্তি নয়, হাতুরী দ্বারা পিটিয়ে শাস্তি নয়, সত্তর হাত দীর্ঘ এক শিকলে বেধে গলায় বেড়ি পড়িয়ে সেদিনই শাস্তি দেয়া হবে যেদিনের ওয়াদা আল্লাহ করেছেন।

(৩০) এই আয়াত দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই, শাস্তি পরকালে।


[৪৬:৩৪] (সেদিন) আল্লাহ বলবেন শাস্তি ভোগ করো- ছূরা আহকাফ আয়াত ৩৪।

আলোচনঃ আল্লাহ কোন দিন শাস্তি ভোগ করতে বলবেন? কবরে নাকি কিয়ামতে?

(৩১) এই আয়াত দ্বারাও কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে শাস্তি ভোগ করার কথা আল্লাহ বলেন নাই?

[৫১:১৩-১৪] সেদিন তারা অগ্নিতে পতিত হবে- (বলাহবে) তোমরা শাস্তি ভোগ করো। ছূরা জারিয়াত আয়াত-১৩-১৪।

আলোচনাঃ সেদিন আল্লাহ বলবেন, তোমরা শাস্তি ভোগ করো। আল্লাহ কোন দিন শাস্তি ভোগ করতে বলবেন কবরে নাকি কিয়ামতের বিচারের দিনে?

(৩২) এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

[৫২:১৩] (আল্লাহ বলেন) সেদিন ধাক্কা মেরে মেরে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। ছূরা তূর আয়াত ১৩। 

আলোচনঃ লক্ষ্য করেছেন কি? সেদিনই ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে জাহান্নামের দিকে নেয়া হবে। বার বার বলা হয়েছে সেদিনের শাস্তির কথা। কবরে শাস্তির কথা আল্লাহ একবারও বলেছেন কি?

(৩৩) এই একটি মাত্র আয়াত ও যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।


অনেকেই বলে শাস্তি ৪ জায়গায়

কবরের শাস্তি প্রমাণ করার জন্য অনেকেই ছূরা তাওবার ১০১ নং আয়াত দেখিয়ে বলে থাকে যে, মৃত্যু যন্ত্রনা ও কবর আযাবসহ চারবার শাস্তির কথা ক্বুরআনে বলা হয়েছে। অর্থাৎ একবার পৃথিবীতে শাস্তি, একবার মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি, একবার কবরে শাস্তি এবং পরে জাহান্নামে শাস্তি। তাদের এই যুক্তি এখনই মিথ্যা প্রমাণীত হয়ে যাবে।

কারণ, আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষকে অসংখ্যবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলচ্ছাস, ভূমিকম্প, ঝড়-তুফান ও বিভিন্ন ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা বিভন্ন সময় বিভিন্নরকম শাস্তি দিয়ে থাকেন। এই শাস্তি আল্লাহ কাউকে একবার, আবার কাউকে দুইবার, আবার কাউকে তিনবার ও তার চেয়েও বেশি দিয়ে থাকেন যাকে বলা হয়েছে দুনিয়ার শাস্তি। তারপর মুনাফেকদের মৃত্যুর সময় একটা শাস্তি আছে যে শাস্তিকে আল্লাহ ক্বুরআনের ভাষায় “ছাকরাতাল মাঊত” বা মৃত্যুযন্ত্রনা বলেছেন তবে তা অল্প কিছুক্ষনের জন্য- ৫০:১৯। তারপর চুরান্ত শাস্তি আখেরাতে। কাজেই ছূরা তাওবার ১০১ নং আয়াতের দুইবার শাস্তি তা পৃথিবীতেই অর্থাৎ মানুষ জীবিতো থাকা অবস্থায় দুনিয়ার শাস্তি এবং জীবিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুর সময় মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি হবে, তা কবরে নয়। কারণ, কবরে মানুষ জীবিত থাকে না। আল্লাহ রছূলকে বললেন-

[৯:১০১] আর কিছু তোমার আশ-পাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনঢ়। তুমি তাদের জানো না; আমি তাদের জানি। আমি তাদেরকে আযাব দান করবো দুবার, তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে কঠিন আযাবের দিকে। ছূরা তাওবা আয়াত ১০১।

আলোচনাঃ এই আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীর সকল অপরাধীর কথা বলেননি। কিছু মুনাফেক ও কিছু মদীনাবাসীকে নির্দিষ্ট করে বলেছেন যে, তাদেরকে আল্লাহ জানেন এবং তাদেরকে দুবার শাস্তি দিবেন। এই দুবার শাস্তি পৃথিবীতে গজব ও মৃত্যুর সময় মৃত্যুযন্ত্রনায় পতিত হবে যে সময়গুলোতে রছূল ও রছূলের সঙ্গি-সাথীরা সুখে দিন কাটাবে, এবং রছূল ও রছূলের সঙ্গি-সাথীদের মৃত্যুর সময় তাদেরকে ছালাম সহকারে শান্তিতে মৃত্যু ঘটানো হবে- ১৬:৩২। এই আয়াতের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই আয়াতে শাস্তির ব্যপারে আল্লাহ “কবর” শব্দ উল্লেখ করেননি। শাস্তির ব্যপারে অনুমান ও নির্দিষ্ট করে সরাসরি “কবর” শব্দ উল্লেখ করা মোটেই ঠিক না। পৃথিবীর শাস্তি দুইবার যথা গজব ও মৃত্যুযন্ত্রনা। কিছুক্ষনের জন্য মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদি শাস্তি দুই জায়গায় যথা পৃথিবীতে ও আখেরাতে, কবরে কোনো শাস্তির কথা আল্লাহ ক্বুরআনে বলেননি।

মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি ছাড়া শাস্তি দুই সময় দুনিয়া ও আখিরাতে

[৩:৫৬] (আল্লাহ বলেন) অতঃপর যারা অবিশ্বাসী, তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে কঠোর শাস্তি দেবো এবং কেউই তাদের সাহায্যকারী নেই। ছূরা আল ইমরান আয়াত ৫৬।

[৯:৭৪]…আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ শাস্তি দিবেন…। ছূরা তাওবা আয়াত ৭৪।

আলোচনাঃ উপোরক্ত দুটি আয়াতে পৃথিবীতে ও আখেরাতে শাস্তি দেয়ার কথা আল্লাহ বলেছেন। এখানে কবরের শাস্তির কথা বলা হয়নি। ছূরা তাওবার ১০১ আয়াতে যদি পৃথিবীর দুইবার শাস্তির একটি কবরের শাস্তি হয় তাহলে উপোরক্ত আয়াতে আল্লাহ কবর বাদ দিয়ে কেনো দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির কথা বললেন? অর্থাৎ আল্লাহ কবর আযাব বলেননি কেনো?

(৩৩) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে কি বলে দেখুন! 

[১৩:৩৪] (আল্লাহ বললেন) তাদের জন্যই রয়েছে দুনিয়ার জীবনে আযাব, আর আখিরাতের আযাব তো আরো কঠিন। আল্লাহর আযাব থেকে তাদের কোনো রক্ষাকারী নেই। ছূরা র’দ আয়াত ৩৪।

আলোচনাঃ লক্ষ্য করুন “দুনিয়ার জীবনে আযাব”। অর্থাৎ এই আয়াতে আল্লাহ “হায়াতিদ দুন’ইয়া” অর্থঃ “দুনিয়ার জীবনে” বলেছেন। “হায়াত” অর্থ জীবন। হায়াত বা জীবন না থাকলে আযাব কাকে দেয়া হবে? মানুষের জন্য মৃত্যু কোনো জীবন নয়। শাস্তি দিতে হলে তার জীবন থাকতে হবে। তাই আল্লাহ দুনিয়ার জিবনে ও আখেরাতের জীবনে শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আল ক্বুরআনে উপোরক্ত আয়াতগুলোর মতো এরকম আরও বহু আয়াত আছে। আযাব সম্পর্কিত প্রতিটি আয়াতেই বলা হয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের আযাব। উপোরক্ত আয়াতে প্রমাণ হলো যে, শাস্তি দুই জায়গায়, অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে লাঞ্চনা, হিনতা, অপমান, বিভিন্ন গজব ও মৃত্যু যন্ত্রনার দ্বারা দুনিয়ার শাস্তি। এবং পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি। দুনিয়ার জীবনে, কবরের জীবনে ও আখিরাতের জীবনে অর্থাৎ এইরকম তিন জায়গায় শাস্তি দেয়ার কথা আল্লাহ ক্বুরআনে একবারও বলেননি? কবরে শাস্তি থাকলে আল্লাহ তিন সময় শাস্তির কথা বলতেন। আল্লাহ কি পৃথিবীতে, কবরে ও পরকালে অর্থাৎ তিন জায়গায় শাস্তির কথা বলেছেন? বলেননি।

(৩৪) এই একটি মাত্র প্রমাণ দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

আপনি হয়তো বলতে পারেন যে, দুনিয়ার শাস্তিই হচ্ছে দুনিয়া ও কবরের শাস্তি, যেহেতু কবর তো এই দুনিয়াতেই, কিন্তু আপনার এই যুক্তি কুরআন দ্বারা টেকে না। কারণ মৃত্যু হবার আগ পর্যন্ত পৃথিবীর শাস্তির কথা আল্লাহ সরাসরি বলেছেন। দেখুন আল্লাহ কি বলেন?

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে শাস্তি

[৯:৫৫] (আল্লাহ রছূলকে বলেছেন) কাজেই তাদের ধন-সম্পত্তি আর সন্তান-সন্ততি যেনো তোমার চোখ ধাঁধিয়ে না দেয়, ওসব দিয়েই আল্লাহ দুনিয়াতে ওদেরকে শাস্তি দিতে চান আর কাফির অবস্থাতেই যেনো তাদের জান বাহির হয়। ছূরা তাওবা আয়াত ৫৫। অনুবাদঃ তাইছিরুল ক্বুরআন।

[৯:৮৫] (আল্লাহ রছূলকে বলেছেন) আর তোমাকে যেন মুগ্ধ না করে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি, আল্লাহ এর দ্বারা কেবল তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে আযাব দিতে চান এবং তাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত যেনো তারা কাফেরই থাকে। ছূরা তাওবা আয়াত ৮৫।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, মৃত্যু পর্যন্ত দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। এই শাস্তি দিনিয়ায় এবং মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি। আল্লাহ কি মৃত্যুর পরে কবরের জীবনে শাস্তির কথা বলেছেন? বলেননি।

(৩৫) এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

পৃথিবীর শাস্তি

[১৬:২৬] (আল্লাহ বলেন) তাদের পূর্ববর্তীরাও চক্রান্ত করেছিল। আল্লাহ তাদের ইমারাতের ভিত্তিমূলে আঘাত করেছিলেন; ফলে ইমারাতের ছাদ তাদের উপর ধ্বসে পড়ল এবং তাদের প্রতি শাস্তি নেমে এলো এমন দিক হতে যা ছিল তাদের ধারনার বাহির। ছূরা নাহল আয়াত ২৬।

আলোচনাঃ দেখলেন তো? আল্লাহ দুনিয়ায় শাস্তির কথা বলেছেন। কবর আযাবের ভয়াবহতা নিয়ে যতো কথা শোনা যায় তা যদি সত্য হয় তাহলে আল্লাহ কি তা একবারও বলতেন না? যেমন, প্রশ্ন করা হবে দুই সময়, শাস্তিও দুই সময়, ঠিক তেমনি পুরষ্কারও দুই সময়।

দুইবার পুরষ্কার

[২৮:৫৪] (আল্লাহ বলেন) তাদের ছবুরের কারণে তারা দুইবার পুরস্কৃত হবে। তারা ভালো দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে। আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। ছূরা ক্বাছাছ আয়াত ৫৪। (লক্ষ্য করুন! দুইবার পুরষ্কার)।

[১৬:৪১] যারা অত্যাচারিত হওয়ার পর আল্লাহর পথে হিজরাত করেছে আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস প্রদান করবো এবং আখিরাতের পুরষ্কারইতো শ্রেষ্ঠ। হায়! তারা যদি তা জানতো! ছূরা নাহল আয়াত ৪১। (লক্ষ্য করুন! দুইবার পুরষ্কার)।

[১৬:৩০] (আল্লাহ বলেন)…যারা সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে এই দুনিয়ার মঙ্গল এবং আখিরাতের আবাস আরও উৎকৃষ্ট…। ছূরা নাহল আয়াত ৩০। অনুবাদঃ মুজিবুর রহমান। (লক্ষ্য করুন! দুইবার পুরষ্কার)।

আলোচনাঃ আল্লাহ সরাসরি সুস্পষ্ট করে বলেদিলেন যে, দুইবার পুরষ্কার, দুনিয়া ও আখেরাতে। কবরে যদি শাস্তি ও শান্তি দুটোই থাকতো তাহলে এই আয়াতে আল্লাহ দুইবার পুরষ্কারের কথা বলতেন না। তাহলে আল্লাহ বলতেন যে, যারা সৎকর্ম করবে তাদের জন্য তিন জায়গায় পুরষ্কার রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ কি তিন জায়গায় পুরষ্কারের কথা বলেছেন?

(৩৬) এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

ক্বুরআনে এইরকম আরও অনেক আয়াত আছে যেখানে দুইবার শাস্তি, দুইবার পুরষ্কার ও দুইবার প্রশ্নের কথা বলা হয়েছে। তদ্রুপ মানুষ দুনিয়া চায় ও আখেরাতও চায়, কিন্তু কেউই কবরের শান্তি চায় না, চায় না কবরের আযাব থেকে মুক্তিও।

দুনিয়া ও আখেরাত চায়, কবরে শান্তি চায় না

[৩:১৪৫] (আল্লাহ বলেন) আর আল্লাহর আদেশে লিপিবদ্ধ নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত কেহই মৃত্যুমুখে পতিত হয়না; এবং যে কেহ ইহলোকের প্রতিদান কামনা করে, আমি তাকে তা দুনিয়ায় প্রদান করে থাকি; পক্ষান্তরে যে লোক আখিরাতে বিনিময় কামনা করে আমি তাকে তা প্রদান করবো, এবং আমি কৃতজ্ঞগণকে অচিরেই পুরস্কার প্রদান করবো। আল ইমরান আয়াত ১৪৫।

[৩:১৫২] (আল্লাহ বলেন)…তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা পার্থিব বস্তু কামনা করে এবং কিছু লোক পরকাল পছন্দ করে…। ছূরা আল ইমরান আয়াত ১৫২।

(৩৭) মানুষ দুনিয়া ও পরকাল চায়, কেউই কবর আযাব থেকে মুক্তি চায় না। এই যুক্তি দ্বারা প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো আযাব নাই তাই মানুষ কবর আযাব থেকে মুক্তিও চায় না।

প্রশ্ন যেমন দুই জায়গায়, তেমন শাস্তিও দুই জায়গায়, পুরষ্কার দুই জায়গায়, মানুষ চায়ও দুটি স্থান যথা দুনিয়া ও আখেরাত, তদ্রুপ আমল বা কর্ম নষ্টও হবে দুই জায়গায়। 

আমল নষ্ট দুনিয়া ও আখেরাতে

[৯:৬৯] (আল্লাহ বলেন) …আর তোমরা খেল-তামাশায় মত্ত হয়েছো, যেমনিভাবে তারা মত্ত হয়েছে। এদেরই আমলসমূহ নষ্ট হয়ে গিয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে। আর তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। ছূরা তাওবা আয়াত ৬৯।

[২:২১৭]…তোমাদের মধ্যে যারা নিজের দ্বীন থেকে ফিরে দাঁড়াবে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের যাবতীয় আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে…। ছূরা বাক্বারা আয়াত ২১৭।

[৩:২২] এরাই তারা যাদের সমুদয় ‘আমল দুনিয়া ও আখেরাতে নিষ্ফল হবে এবং তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। ছূরা আল ইমরান আয়াত ২২।

আলোচনাঃ আমল নষ্ট হলে দুনিয়ায় বিভিন্ন গজব দ্বারা শাস্তি পাবে এবং মৃত্যুর সময় মৃত্যু যন্ত্রনাও হবে। আমলের বিষয়ও দুই জায়গার কথা বলা হয়েছে। এখানেও বারঝাখ বা কবরের জীবন, কবরের শাস্তি, কবরের শান্তি সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি।

(৩৮) এই বিষয়টি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে শান্তি ও শাস্তি বলতে কিছুই নাই। তদ্রুপ সম্মানও দুই জায়গায়।

সম্মানের ব্যপারেও দুইবার দুনিয়া ও আখেরাতে

দুনিয়ার সম্মানঃ

[৮৯:১৫] (আল্লাহ বলেন) মানুষ এমন যে, তার প্রতিপালক যখন তাকে পরীক্ষা করেন সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন তখন সে বলে, ‘আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন। ছূরা ফজর আয়াত ১৫।

পরকালের সম্মানঃ

[৭০:৩২-৩৫] এবং যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে, এবং যারা তাদের সাক্ষ্যদানে সরল-নিষ্ঠাবান, এবং যারা তাদের নামাযে যত্নবান, তারাই জান্নাতে সম্মানিত হবে। ছূরা মা’আরিজ আয়াত ৩২-৩৫।

দুনিয়ার ও পরকালের সম্মানঃ

[৩:৪৫] যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তোমাকে তাঁর এক বানীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হলো মসীহ-মারইয়াম-তনয় ঈসা, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি সম্মানের অধিকারী…।

আলোচনাঃ লক্ষ্য করুন! উপরের তিনটি আয়াতের প্রথম আয়াতে দুনিয়ার সম্মান, দ্বিতীয় আয়াতে আখেরাতের সম্মান এবং তৃতীয় আয়াতে একসাথে দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মান, অর্থাৎ সম্মানের ব্যপারেও দুনিয়া ও আখেরাতের কথা বলা হয়েছে। শুধু তাই নয় মৃত্যুও দুই বার জীবনও দুই বার। কবরের জীবনের কথা আল্লাহ ক্বুরআনে একবারও বলেননি। যারা বলে কবরে জীবন আছে শাস্তি আছে তারা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে।

দুই বার মৃত্যু দুই বার জীবন

[২:২৮] (আল্লাহ বলেন) কীভাবে তোমরা আল্লাহর সাথে কুফরী করছো অথচ তোমরা ছিলে মৃত? অতঃপর তিনি তোমাদেরকে জীবিত করেছেন। এরপর তিনি তোমাদেরকে মৃত্যু দেবেন অতঃপর জীবিত করবেন। এরপর তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। ছূরা বাক্বারা আয়াত ২৮।

কিয়ামতে স্বীকারঃ দুইবার মৃত্যু দুইবার জীবন

[২৩:১১] (কিয়ামতে) তারা বলবে হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে দু বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু বার জীবন দিয়েছেন। এখন আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি। অতঃপর এখন নিস্কৃতির কোনো উপায় আছে কি? ছূরা মু’মিনূন আয়াত ১১।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন দুইবার জীবন দুইবার মরন, তিনবার জীবন বা মানুষ কবরে জীবিত থাকে এমন কথা আল্লাহ ক্বুরআনে একবারও বলেননি। যারা বলে কবরে “রূহ” দিয়ে শাস্তি দেয়া হয় তারা ডাহা মিথ্যা কথা বলে। কারণ, কবরে মানুষকে জীবন দিলে দুইবার মৃত্যু ও তিনবার জীবন দেয়া হবে, অথচ আল্লাহ ক্বুরআনে বলেছেন দুইবার জীবন দুইবার মৃত্যু। যারা বলে কবরে “রূহ” দিয়ে শাস্তি দেয়া হয় তারা আল্লাহর উক্ত আয়াত বিশ্বাস করে করে না। যারা বলে কবরে শাস্তি আছে তারা তিনবার জিবন দেয়ার কথা বলে আল্লাহর আয়াতকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

(৩৯) এই দুটি আয়াত দ্বারাই জলন্তভাবে প্রমাণ হয় যে, কবরে “রূহ” দেয়া হয় না, এবং “রূহ” না দেয়াতে প্রাণহীন দেহে কোনো শাস্তিও দেয়া যায় না।


[১৬:২১] (আল্লাহ বলেন) তারা মৃত-প্রাণহীন এবং কবে তারা পুনরুজ্জীবিত হবে, তা তারা জানে না। ছূরা নাহল আয়াত ২১।

আলোচনাঃ লক্ষ্য করুন! আল্লাহ বললেন তারা মৃত/ নিস্প্রাণ/ প্রাণহীন, জীবিত নয় এবং তারা জানে না যে, কখন তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। যে জানে না, যে প্রাণহীন তাকে শাস্তি দেয়া হয় কি করে? ন্যুনতম জ্ঞান থাকলেও তারা ঐ ধরনের কথা বলতে পারতো না। আচ্ছা বলুন তো! প্রাণহীন দেহো কি কিছু শুনতে পায়? তাকে শাস্তি দিলে সে কি তা বোঝতে পারে? কে প্রাণহীন দেহে শাস্তি দেয়? প্রমাণ কি?

(৪০) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, মৃতো প্রাণহীন দেহে কোনো শাস্তিই হয় না?


আল্লাহ আল ক্বুরআনে অসংখ্য আয়াতে বলেছেন যে, এই ক্বুরআন পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, ক্বুরআন তাফছীলাল কিতাব। ছূরা নাহলের ৮৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, প্রত্যেক বিষয় ব্যাখ্যাসহ মুছলিমদের জন্য কিতাব নাযিল করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে যে, যে কিতাবে প্রত্যেক বিষয় বলা হয়েছে সেই কিতাবে কবরের প্রশ্ন, কবরের আযাবের কথা এবং “মুনকার নেকির” দুইজন ফেরেস্তার কথা থাকবে না কেনো? সাধারণ মানুষ মনে করে যে, কবর আযাবের সমস্ত কথা অবশ্যই ক্বুরআনে আছে, তা না হলে রছূলুল্লাহ কেনো বলেছেন? হাদীছের বাণীতে কেনো আসলো? এবং আলেমরাই বা কেনো বলে থাকে? আসলে তারা জানে না যে, কবর আযাব সম্পর্কে রছূলুল্লাহ একটি কথাও বলেননি এবং আল্লাহ ক্বুরআনে একটি আয়াতেও বলেননি, তার জলন্ত প্রমাণই আল ক্বুরআন। এতদিন যা শুনে আসছেন তা সবই মিথ্যা, ক্বুরআন থেকে কবর আযাবের প্রমাণ কেউ দেখাতে পারে না, পারবেও না।

আয়াত প্রশ্নবিদ্ধ হবে 

কবরে যদি প্রশ্ন ও শাস্তি থাকে তাহলে আল্লাহর অসংখ্য আয়াত প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং ক্বুরআনে বৈপরীত্য দেখা দেবে। অথচ আল্লাহ ছূরা নিছার ৮২ নং আয়াতে বলেছেন যে, “ক্বূরআনে কোনো বৈপরিত্ব নাই বা কোনো অসংগতি নাই।

তবে বলে রাখা ভালো যে, শাস্তি দুই জায়গায় যথা পৃথিবীতে ও আখেরাতে এবং শান্তি বা পুরষ্কারও দুই জায়গায় যথা পৃথিবীতে ও আখেরাতে। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম শাস্তি দিয়ে থাকেন এবং মৃত্যুর সময়ও মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি দিয়ে থাকে যা উভয়ই দুনিয়ার শাস্তি। আর আখেরাতের শাস্তি ভয়ংকার। আল্লাহ বার বার বলেছেন যে, শাস্তি এই পৃথিবীত এবং শাস্তি আখেরাতে। তবে মৃত্যুর সময় অল্প কিছুক্ষনের জন্য শাস্তি তাও দুনিয়াতে। ফেরেস্তাগণ প্রশ্ন করেন মৃত্যুর সময়-৪:৯৭, এবং আল্লাহ অসংখ্য প্রশ্ন করবেন আখেরাতে। কবরে যদি প্রশ্ন ও শাস্তি থাকে তাহলে আল্লাহর কথা দুইরকম হয়ে যাবে এবং আল্লাহ বিধান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আল্লাহ বলেছেন “হাতূ বুরহানাকুম” অর্থঃ তোমরা তোমাদের দলীল পেশ করো- ছূরা বাক্বারা আয়াত ১১১। আল্লাহ আরও বলেছেন “এই ক্বুরআন মানবজাতির জন্য সুস্পষ্ট দলীল”- ছূরা জাছিয়া আয়াত ২০। যারা বলে কবরে শাস্তি আছে তারা এই দুই আয়াতের দলীলের ভিত্তিতে কবরের প্রশ্ন, কবরের আযাব ও মুনকার নেকির ফেরেশতা সম্পর্কে ক্বুরআন থেকে দলীল পেশ করুন।

(৪১) ক্বুরআন থেকে যদি দলীল দেখাতে না পারেন তাহলে বোঝা যাবে যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

প্রশ্ন মৃত্যুর সময় ও কিয়ামতে

[৪:৯৭] (আল্লাহ বলেন) নিশ্চয় যারা নিজদের প্রতি যুলমকারী, ফেরেশতাগণ তাদের জান কবজ করার সময় বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে’?…ছুরা নিছা আয়াত ৯৭।

আলোচনাঃ লক্ষ্য করুন! মৃত্যুর সময় ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করেন “তোমরা কী অবস্থায় ছিলে”? অর্থাৎ হিজরত করোনি কেনো? কিন্তু কবরের তিনটি প্রশ্ন সম্পর্কে আল্লাহ ক্বুরআনে কিছুই বলেননি। আপনি হয়তো বলবেন যে, এই দুই একটি আয়াত দিয়ে কি হবে? আরও অনেকে আয়াত আছে যেখানে কবরের প্রশ্নের কথা বলা আছে। আমি বলবো কবরের প্রশ্ন ও কবর আযাবের পক্ষ্যে ক্বুরআনে একটি আয়াতও নাই, তবে কিয়ামতের প্রশ্ন সম্পর্কে আমি ক্বুরআন হতে অসংখ্য আয়াতও উপাস্থাপন করেছি। মনে রাখবেন প্রমাণের জন্য আল্লাহর একটি আয়াত বা একটি বিধানই যতেষ্ঠ। প্রশ্ন যেমন দুই সময় তেমনি শাস্তিও দুই সময়। তবে কারও কারও মৃত্যুর সময় কিছুক্ষন মৃত্যু যন্ত্রনা হয়ে থাকে। তদ্রুপ কাউকে মৃত্যুর সময় ছালাম দেয়া হয়- ১৬:৩২। পৃথিবীতে মৃত্যুর সময় ও আখেরাতের প্রশ্ন সম্পর্কিত আয়াত নং দেয়া হলো, উক্ত আয়াতগুলো আপনারা ক্বুরআনের সাথে মিলিয়ে দেখে নিতে পারেন অথবা আমার ধারাবাহিক প্রশ্নসম্পর্কিত পোষ্ট ৭ম পর্ব পড়তে পারেন।

প্রশ্ন সম্পর্কিত আয়াতগুলো-

(১৭:৩৬) (৪৩:৪৪) (১৬:৩০) (৪৫:৩১) (২৩:১০৫-১০৬) (৬:১৩০) (২৭:৮৪) (৬:৩০) (৩৯:৭১) (৭:৬) (২৮:৬৫) (২৯:১৩) (১৬:৫৬) (১০২:১-৮) (২৩:৬৪-৬৮) (১৬:৯৩) (১৬:২৭) (১৫:৯২-৯৩) (৩৫:৩৭) (১৭:৩৪) (২৮:৬২) (২৮:৭৪) (৪১:৪৭) (৪:৯৭) (৩৪:৪০) (৫:১১৬) (৩৩:১৫) (৪৭:২৭-২৮)।


কবরে তিনটি প্রশ্ন প্রসঙ্গেঃ

আল ক্বুরআন বুঝে বুঝে পড়া মুষ্টিমেয় মানুষ ছড়া অধিকাংশ মানুষই বলে থাকে যে, কবরে লাশ দাফন করার পর মানুষজন ৪০ কদম চলে যাওয়ার পর মুনকার নেকির নামে দুইজন ফেরেস্তা এসে কবরে মৃতো দেহোকে তিনটি প্রশ্ন করেন যথা- (১) মার রব্বুকা, তোমার রবকে? (২) মান দ্বীনুকা, তোমার ধর্ম কি? (৩) মান নাবি’ইউকা, তোমার নবী কে? আল্লাহ বলেছেন যে, ক্বুরআন প্রত্যেক বিষয় ব্যাখ্যাসহ নাজিল করা হয়েছে- ১৬:৮৯, এবং ক্বুরআনে প্রত্যেক বিষয়ের উপমা দেয়া হয়েছে- ১৭:৮৯। প্রশ্নঃ প্রত্যেক বিষয় ব্যাখ্যাসহ ক্বুরআন নাজিল করা হলে কবরের ঐ তিনটি ছওয়াল-জওয়াবের কথা ক্বুরআনে নাই কেনো? আল্লাহ কি তা বলতে ভুলে গেছেন? (মা’আজাল্লাহ)। যেহেতু আল্লাহ ক্বুরআনে বলেননি তাই রছূলুল্লাহও বলেননি। কাজেই, ঐ প্রশ্নগুলোর কোনো ভিত্তি নাই, উহা অমুলক/ অবান্তর, মানুষের বানানো। আচ্ছা বলুনতো মৃতো দেহকে প্রশ্ন করলে সে কি জবাব দিতে পারে? যেহেতু আত্মা বা প্রাণ দেয়া হবে কিয়ামতের সময়- ৮১:৭।


হে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ একবার ভাবুন! আল্লাহ কি কবরে প্রশ্ন করবেন নাকি মৃত্যুর সময় ও বিচার দিবসে প্রশ্ন করবেন?

(৪২) উপোরক্ত যুক্তি ও প্রমাণ দ্বারা ইহাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো প্রশ্ন নাই তাই কোনো শাস্তিও নাই।

মূল কথা হলো, ৩০ পারা ক্বুরআনের মধ্যে ঐ ৩ টি প্রশ্নের কথা আল্লাহ বলেননি। তবে কিয়ামতের বিচারের দিনে আল্লাহ মানুষকে অসংখ্য প্রশ্ন করবেন যা তিনি ক্বুরআনে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই প্রশ্নগুলোর কথা আমাদেরকে না শুনিয়ে গোপন রাখা হয়েছে। ঐ প্রশ্নগুলোর কথা কেউ কাউকে বলে না, শিখায়ও না। তাই আমি আমার ধারাবাহিক ৭ম পর্বে ক্বুরআন থেকে ২৬ টি প্রশ্ন তুলে ধরেছি।


রূহ

[১৭:৮৫] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিনঃ রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে। ছূরা বনি ইছরাঈল আয়াত ৮৫।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, “রূহ” আল্লাহর একটি আদেশ মাত্র। কিয়ামতে আল্লাহ যখন আদেশ করবেন তখন প্রতিটি দেহে আল্লাহর আদেশ ততা “রূহ” প্রবেশ করবে কাজেই, “রূহ” বলতে কিছূ নাই। তারপরও যারা বলেন যে, কবরে “রূহ” দিয়ে তারপর শাস্তি দেয়া হয় তাদের এই দলীলবিহীন ও মনগড়া কথায় তারা নিজেরাই ধরা পরে যায়। কারণ, যদি কবরে “রূহ” দেয়া হয় তাহলে পুনরায় কবরবাসীর জান কবজ করতে হবে। আল্লাহ কি কবরের মানুষের জান কবজ করার কথা একবারও বলেছেন?

(৪৩) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে “রূহ” দেয়া হয় না এবং শাস্তিও দেয়া হয় না?


প্রথমবার সকল মানুষের “নফছ”, আত্মা বা প্রাণ সৃষ্টি করে সকল প্রাণের সাথে আল্লাহ কথা বলেছিলেন এবং অঙ্গিকার নিয়ে ছিলেন। সেই প্রাণ পৃথিবীতে না আসাতে পৃথিবীর জন্য তা মৃতো। পৃথিবীতে আসলে ঐ প্রাণ জীবীত হলো। তাহলে একবার মৃতো একবার জীবিতো। পৃথিবীতে বসবাসের পর আবার মৃত্যু হবে এবং কিয়ামতের সময় আবার জিবিত করা হবে, তাহলে আরও একবার মৃত্যু এবং জীবিতো। তাহলে দুইবার মৃত্যু দুইবার জীবন। যদি কবরে “রূহ” দেয়া হয় তাহলে দুইবার মৃত্যু ও তিনবার জীবন দেয়া হয়? আল্লাহ কি তিনবার জীবন দেয়ার কথা বলেছেন? কাউকে শাস্তি দেয়া হলে তাকে জাগ্রত থাকা অবস্থায় শাস্তি দিতে হয়। মরা মানুষকে শাস্তি দিলে সে কি তা অনুভব করতে পারে? মরা মানুষকে হিন্দুরা আগুনে পোড়ালে মরা মানুষ কি ব্যাথা পায়? ব্যাথা পেলে কি তারা আগুনে পোড়াতে পারতো? তাহলে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত মৃতো মানুষকে কিভাবে শাস্তি দেয়া হবে?

(৪৪) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারাই তো প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো আযাব নাই।

“আযাবাল আখেরাহ”

[১১:১০৩] (আল্লাহ বলেন) নিশ্চয় এতে নিদর্শন/ প্রমাণ রয়েছে তার জন্য যে আখেরাতের আযাবকে ভয় করে। (আযাবাল আখেরাহ) উহা এমন একদিন, যে দিন সব মানুষই সমবেতো হবে, সেদিনটি যে হাযিরার দিন। ছূরা হূদ আয়াত ১০৩।

আলোচনাঃ আল্লাহর এই কথায় প্রমাণ হয় যে, “এতে” অর্থাৎ এই ক্বুরআনে নিদর্শন বা প্রমাণ আছে তার জন্য যে, “আযাবাল আখেরাতকে” ভয় করে। তাহলে যে আখেরাতের আযাবের পাশাপশি কবরের আযাবের কথা বলে শেরেক করবে তার জন্য ক্বুরআনে কোনো নিদর্শন/ প্রমাণ থাকবে না কারণ, সে আল্লাহর আইনের সাথে শেরেক করলো। আল্লাহ কবরের আযাবের কথা বলেননি, বলেছেন আখেরাতের আযাবের কথা। যারা কোনো দলীল/ প্রমাণ ছাড়াই বলে যে, কবরে আযাব হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ আল্লাহ কি কবরের আযাবকে ভয় করতে বলেছেন? নাকি আখেরাতের আযাবকে ভয় করতে বলেছেন? কোনটি?

হে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! আল্লাহর এই কথা নিয়ে চিন্তা করুন! আল্লাহ কি “আযাবাল কবর” বলেছেন নাকি “আযাবাল আখেরাহ” বলেছেন কোনটি? আল্লাহ আখেরাতের আযাবকে ভয় করতে বলেছেন, আর পৃথবীর মানুষ কবরের আযাবকে ভয় করতে বলে, আপনি কার কথা মানবেন আল্লাহর কথা নাকি মানুষের কথা? আল্লাহ আযাবুল কবর বলে কোনো বাক্য ৩০ পারা ক্বুরআনের মধ্যে কোথাও উচ্চারণ করেননি। আল্লাহর ক্বুরআন পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ। যদি কবরে আযাব থাকতো তাহলে আল্লাহ ক্বুরআনে একবার হলেও বলতেন যে, “তোমরা কবরের আযাবকে ভয় করো” কিন্তু আল্লাহ তা বলেননি, আল্লাহ বলেছেন আখেরাতের আযাবকে ভয় করো।

(৪৫) এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো আযাব নাই এটাই মহা সত্য। তার পরও ক্বুরআন অস্বীকারকারীরা ক্বুরআনের এই আয়াত অস্বীকার করে।

“ইয়াওমা ইয়া’তীমুল আযাব”

[১৪:৪৪] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) যেদিন তাদের শাস্তি আসবে/ “ইয়াওমা ইয়া’তীমুল আযাব” সেদিন সম্পর্কে তুমি মানুষকে সতর্ক করো। তখন যালিমরা বলবেঃ হে আমাদের রবঃ আমাদেরকে কিছুকালের জন্য অবকাশ দিন…। ছূরা ইবরাহীম আয়াত ৪৪।

আলোচনাঃ আল্লাহ রছূলকে কোন সময়ের শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করতে বলেছেন কবরের শাস্তি নাকি আখেরাতের শাস্তি? যদি কবরে শাস্তি থাকতো তাহলে আল্লাহ কি বলতেন না যে, তুমি মানুষকে কবরের ভয়াবহ শাস্তির সম্পর্কে সতর্ক করো? আল্লাহ কি তা বলেছেন? আমরা বিশ্বাস করি যে, রছূল কোনোদিন আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে কবর আযাব সম্পর্কে ছাহাবিদেরকে সতর্ক করেননি। আল্লাহর রছূল আল্লাহর হুকুম অমান্য করে নিজেই কবর আযাব সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে পারেন কি?

(৪৬) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই?


কিয়ামত কখন হবে? যেদিন শাস্তি দেয়া হবে

[৫১:১২:১৪] তারা (কাফিররা) জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিন কবে হবে? (বলে দিন) যেদিন তারা অগ্নিতে সাজাপ্রাপ্ত হবে…। ছূরা জারিয়াত আয়াত ১২-১৪।

আলোচনাঃ হে ক্বুরআন অস্বীকারকারী মিথ্যা আত্মসমর্পণকারী ও মিথ্যা কবর আযাবের দাবীদাররা! আল্লাহ কখন শাস্তি দেয়ার কথা বলেছেন কবরে নাকি শুধুই কিয়ামতে? কবরের আযাবের শেষে কিয়ামত হবে এমন কথা আল্লাহ বলেছেন কি?

(৪৭) হে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! হে শিক্ষিত সম্প্রদায়! এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবর আযাবের সমস্ত কথা মিথ্যা?

লোকে তোমাকে প্রশ্ন করে:

[২:১৮৯] লোকে তোমাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে…। ছূরা বাক্বারা আয়াত ১৮৯।

[২:২২২] তারা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে…। ছূরা বাক্বারা আয়াত ২২২।

[৮:১] লোকে তোমাকে আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে…। ছূরা আনফাল আয়াত ১।

[২:২১৭] সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন?…। ছূরা বাক্বারা আয়াত ২১৭।

[২:২১৯] তারা জিজ্ঞাসা করে কী ব্যয় করবে…। ছূরা বাক্বারা আয়াত ২১৯।

[৫১:১২:১৪] তারা (কাফিররা) জিজ্ঞেস করেঃ কর্মফল দিন কবে হবে?…। ছূরা জারিয়াত আয়াত ১২-১৪।

[১৭:৮৫] তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিনঃ…। ছূরা বনিইছরাঈল আয়াত ৮৫।

[২:২২০] তারা তোমাকে দুনিয়া, আখিরাত ও ইয়াতীমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে…। ছূরা বাক্বারা আয়াত ২২০।

[২৫:৩৩] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) তারা তোমার নিকট এমন কোন সমস্যা উপস্থিত করেনি যার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আমি তোমাকে দান করিনি। ছূরা ফুরক্বান আয়াত ৩৩।

আলোচনাঃ আল্লাহ বললেন যে, সেই সময় সাধারণ জনগণ বা ছাহাবাগণ রছূলকে যে যে প্রশ্ন করেছিলো আল্লাহ রছূলকে তার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরও বলে দিয়েছেন। কিন্তু কবরের ব্যপারে রছুলকে কেউ কোনোদিন কোনো প্রশ্ন করেনি, যদি করতো তাহলে সে কথাও আল্লাহ ক্বুরআনে বলে দিতেন। পুরো ক্বুরআনের মধ্যে কবর আযাব সম্পর্কে কোনো মানুষ রছূলকে প্রশ্ন করেছেন এমন একটি আয়াতও কেউ দেখাতে পারবে না।

(৪৮) এতো জিজ্ঞাসার মধ্যে কবর আযাব সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসা না থাকাতেই প্রমাণ হয় যে, কবর আযাব বলে কোনো শাস্তিই নাই।


যারা বলে কবরে আযাব হয় তারা কবর আযাব সম্পর্কে একটি আয়াত পেশ করুন। অর্থাৎ রছূলকে কবর আযাব সম্পর্কে ততকালীন জনগণ বা ততকালীন ছাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করেছিলো আর আল্লাহ তার উত্তর দিয়েছিলেন এমন একটি আয়াত পেশ করুন। কারণ, উপরের ২৫:৩৩ আয়াতে আল্লাহ বলে দিয়েছেন যে, তারা রছূলকে যা যা জিজ্ঞাসা করেছে আল্লাহ রছূলকে তার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা জানিয়ে দিয়েছেন। যদি আপনারা দেখাতে না পারেন তাহলে আপনারা মিথ্যাবাদী এবং এও প্রমাণ হবে যে, আপনাদের কবর আযাবের দাবী মিথ্যা।

(৪৯) কেউ কবর আযাবের আয়াত দেখাতে না পারলেই প্রমাণ হবে যে, কবরে কোনো আযাবই নাই?


[১৭:৮৯] (আল্লাহ বলেন) আমি এই কোরআনে মানুষকে বিভিন্ন উপমা দ্বারা সব রকম বিষয়বস্তু বুঝিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার না করে থাকেনি। ছূরা বনী ইছরাঈল আয়াত ৮৯।

আলোচনাঃ আল্লাহ সব রকম বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেয়ার পরও ক্বুরআন অস্বীকারকারীরা আল্লাহর কথাকে উপেক্ষা করে মানুষকে কবর আযাবের ভয় দেখায়।


আল্লাহ যেহেতু কবরের প্রশ্ন, কবরের আযাব এবং মুনকার নেকির ফেরেশতা সম্পর্কে ক্বুরআনে একটি আয়াতও নাযিল করেননি, এমন কি কবরের আযাব সম্পর্কে একটি আয়াতও ক্বুরআন থেকে কেউ দেখাতে পারে না, সেহেতু কবরে কোনো প্রশ্ন ও কোনো ধরনের শাস্তিও থাকার কথা নয়।

অথচ ক্বুরআনে আমার দেখা মতে আল্লাহ কিয়ামতের বিচারের দিনে মানুষকে ২৬ টি প্রশ্ন করবেন, যা আমি আমার ধারাবাহিক পোষ্ট ৭ম পর্বে দেখিয়েছি। অথচ আল্লাহর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর কথা সাধারণ আলোচনা তো দুরের কথা কোনো মোল্লাও ওয়াজ মাহফিলে বলে না। তারা বলবে কি করে তারা নিজেরাই তো জানে না। এতোগুলো প্রশ্ন করবেন যে, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে মুখস্ত করে যেতে হবে। সেদিনের সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে আপনার নামাজও আপনাকে জান্নাতে নিতে পারবে না।

ক্বুরআনে নাকি কবর আযাবের আয়াত আছে

অনেকেই ক্বুরআন থেকে ছূরা মু’মিন এর ৪৫ এবং ৪৬ নং আয়াতদুটো দেখিয়ে বলে থাকে যে, এইতো কবর আযাবের কথা ক্বুরআনে পাওয়া গেছে। তাদের দেখানো সেই আয়াতদুটো আপনারাও পড়ুন আর দেখুন যে, ঐ আয়াতে কি কবরের আযাবের কথা বলা হয়েছে? ঐ আয়াতে কি “কবর” শব্দটি আছে? এমন কি ঐ আয়াত কি পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য নাকি শুধুমাত্র ফেরাউন সম্প্রদায়ের জন্য?


ফেরাউন সম্প্রদায়কে সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে আনা প্রসঙ্গে

[৪০:৪৫-৪৬] (আল্লাহ বলেন) অতঃপর আল্লাহ তাকে (মূছাকে) তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ঠ হতে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি পরিবেষ্টন করলো ফির‘আউন সম্প্রদায়কে। সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সম্মুখে এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন বলা হবেঃ ফির‘আউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ করো কঠিনতম শাস্তিতে। ছূরা মু’মিন আয়াত ৪৫-৪৬। অনুবাদঃ মুজিবুর রহমান।

[১১:৯৮] কিয়ামাত দিবসে (ফেরাউন) সে নিজ সম্প্রদায়ের আগে আগে থাকবে, আর তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে নেতৃত্ব দেবে, আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান, যাতে তারা উপনীত হবে। ছূরা হূদ আয়াত ৯৮।

[৪৪:৩১] (আল্লাহ বলেন) ফেরাউন সে ছিলো সীমালংঘনকারীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। ছূরা দুখান আয়াত ৩১। অনুবাদঃ মা’রেফুল ক্বুরআন।

আলোচনাঃ উপোরক্ত আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে ফেরাউন সম্প্রদায় মৃত্যুর সময় কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হলো, অর্থাৎ মৃত্যু যন্ত্রনা। এবং তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে আনা হয়। কোনো বিবেকবান মানুষ বলবে কি যে, এটা আগুনে নিক্ষেপ করা বা আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়? কারণ, আগুনের সামনে নিয়ে আগুন দেখানো আর হাজার হাজার বছর আগুনে জালানো কি এক হয়? মানুষ বুঝেও না বোঝার ভান করে এবং এই বিষয়টি নিয়ে বলে যে, এইতো ক্বুরআনে কবরে শাস্তির কথা বলা হয়েছে, তাদের এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

অথচ এই আয়াতদুটোতে কবরের কথা বলা হয়নি, কবরের শাস্তির কথাও বলা হয়নি, এই আয়াতে “কবর” শব্দটিও নাই, এমন কি ঐ আয়াতে পৃথিবীর সকল অপরাধী মানুষের কথাও বলা হয়নি। শুধু মাত্র ফিরাউন সম্প্রদায়কে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে আনা হয়। অর্থাৎ ফেরাউনের আত্মাকে আগুন দেখানো হয়। কারণ, উপরের ৪৪:৩১ আয়াতে বলা হয়েছে যে, পৃথিবীর সকল মানুষের চেয়ে ফেরাউন হচ্ছে সব চেয়ে বড় সীমালংঘনকারী, যে কিনা নিজেকে একমাত্র “ইলাহ” ও “রব” দাবী করেছিলো- ২৬:২৯, এবং ৭৯:২৪। কাজেই মানুষ সীমালঙ্ঘন করলেও ফেরাউনের মতো এতো বড় সীমালঙ্ঘনকারী আর কেউ নেই। সবচেয়ে বড় সীমালঙ্ঘনকারী হওয়াতে ফেরাউনের জন্য স্পেশাল দুটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যথা পরবর্তি মানুষের নিদর্শণের জন্য “তার দেহো অক্ষত রাখা”- ১০:৯২, এবং তার আত্মাকে সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে এনে আগুন দেখানো হয়, অর্থাৎ এই আগুন ফেরাউনদের জন্য অপেক্ষা করছে, এবং কিয়ামতের বিচারের দিনে চুড়ান্ত শুণানীর পর ফিরাউন সম্প্রদায়কে এই আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।

(৫০) উপোরক্ত আয়াতের প্রমাণের ভিত্তিতে ইহা কি প্রমাণ হলো না যে, ফিরাউনের ঐ বিষয়টি সকল মানুষের জন্য কবর আযাব নয়?

সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে এনে আগুন দেখানো। প্রশ্নঃ এই সকাল-সন্ধ্যা কোন দেশের সকাল-সন্ধ্যা? কোন স্থানের সকাল-সন্ধ্যা? এই পৃথিবীর সকাল-সন্ধ্যা, নাকি আল্লাহর গণনার সকাল-সন্ধ্যা? মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা/ প্রাণ কোথায় চলে যায় তা কেউ বলতে পারবে না। তবে তার আমলনামা ছিজ্জীনে এবং ইল্লিয়্যীনে রাখা হয়। প্রশ্নঃ ছিজ্জীন এবং ইল্লিয়্যীন কি এই পৃথিবীতে? উঃ না। আল্লাহ বলেন, আল্লাহর গণনায় একদিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান- ছূরা ছাবা আয়াত ৫। মানুষের মৃত্যুর পর এই পৃথবীর সমস্থ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কাজেই আল্লাহর গণনার সেই হিসাব অনুযায়ী ফেরাউন সম্প্রদায়কে সকাল-সন্ধ্যায় আগুন দেখানো হয়। যেমন শহিদগণকে সকাল-সন্ধ্যায় রিযিক দেয়া হয়- ৩:১৬৯। এবং জান্নাতিগণের জন্যও সকাল-সন্ধ্যায় রিযিকের ব্যবস্থা আছে- ১৯:৬২। কাজেই, বোঝার বিষয় হলো এই সকাল-সন্ধ্যা পৃথিবীর সকাল-সন্ধ্যা নয়।

(৫১) কাজেই, সকাল-সন্ধ্যার ঐ বিষয়টি শুধুমাত্র ফেরাউন সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট হওয়াতে এবং ঐ আয়াতে কবর শব্দ না থাকাতে ইহাই প্রমাণ হয় যে, তাদের ঐ কবর আযাবের দাবী ও যুক্তি সসম্পূর্ণ মিথ্যা, তাই কবরে কোনো আযাবও হয় না।

যারা বলে কবরে শাস্তি দেয়া হয় তাদের কাছে জিজ্ঞাসাঃ ফেরাউনের দেহোকে কিভাবে শাস্তি দেয়া হয়? হুজুররা ওয়াজ করে ৪০ কদম পার হলেই ফেরেশতা এসে কবরে তিনটি প্রশ্ন করে, কিন্তু ফেরাউনের কপালে তো কবরও জোটেনি, তাহলে ফেরাউনকে প্রশ্ন করলো কে? কিভাবে প্রশ্ন করলো? ফেরাউনের তো কবর নাই, ফিরাউনের দেহো তো অক্ষত, তবে কিভাবে ফিরাউনকে দৈহীক আযাব দেয়া হয়? কিভাবে ফেরাউনকে দুই পাশের মাটি দ্বারা চাপ দেয়া হয়েছে? এই সমস্ত প্রশ্নের একটি সঠিক উত্তরও ক্বুরআন অস্বীকারকারীরা দিতে পারবে কি? যারা বলে কবরে আযাব হয় তাদের কথায় এতো বড় সীমালংঘনকারী বা কাফের হওয়ার পরও ফেরাউন কবর না পাওয়াতে কবর আযাব থেকে বেচে গেলো। কবরে যদি আযাব হয় তাহলে বর্তমানে ফেরাউন খুব শান্তিতেই আছে কারণ, সেতো কবরে নাই, সে মাটির উপরে। যদি বলেন শাস্তি দেহে নয় শাস্তি রূহুতে দেয়া হয় তাহলে সেখানেও আপনি আটকে যাবেন কারণ, “রূহ” বলতে কিছুই নাই যা আমি উপরে দেখিয়েছি। “রূহ” হচ্ছে আল্লাহর একটি আদেশ মাত্র- ১৭:৮৫। রূহ কোথায় থাকে কোথা থেকে আসে তার কোনো প্রমাণ আপনি দিতে পারবেন না। কিয়ামতের আগে “নফছ” বা আত্মা ছাড়া হবে না- ৮১:৭, তাহলে আপনি রূহ পেলেন কোথায়?

(৫২) এতোগুলো যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো আযাব নাই?


মৃত্যু যন্ত্রনাও কি কবরের আযাব?

অনেকেই ক্বুরআন থেকে জান কবজের আয়াতকে কেন্দ্র করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির আয়াতকে কেন্দ্র করে বলে থাকে যে, চারবার শাস্তি দেয়া হবে, একবার পৃথিবীর গজব অতঃপর মৃত্যু যন্ত্রনার শাস্তি, অতঃপর কবরে শাস্তি তারপর জাহান্নামের শাস্তি। তারা যে আয়াত উপাস্থাপন করে সে আয়াতগুলো মুলোতোঃ দুনিয়া ও পরকালের শাস্তির আয়াত কারণ, মৃত্যু যন্ত্রনা তাও জীবিত অবস্থায় এই পৃথিবীতে। এবার দেখা যাক তাদের দেখানো চার জায়গার শাস্তির কথাগুলো কতটুকু সত্য। তিনটি ধারাবাহিক আয়াত একসাথে মন দিয়ে পড়ুন এবং মন দিয়ে আমার আলোচনাটি দেখুন।

[৮:৫০] (আল্লাহ বলেন) (৫০) তোমার প্রতিপালক যখন সত্য কাফেরদের মৃত্যুর মুখোমুখি করলেন, তখনকার অবস্থা যদি তুমি দেখতে পেতে তাহলে দেখতে, প্রাণ হরণের সময় ফেরেশতারা তাদের মুখে ও পিঠে আঘাত করে বলছে, ‘এবার জাহান্নামের দহনযন্ত্রণা ভোগ করো’। (৫১) আর এ শাস্তি তোমাদের কর্মফলের কারণে। আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দার প্রতি জুলুম করেন না। (৫২) ফেরাউনের স্বজন এবং ওদের পূর্ববর্তী সত্য অস্বীকারকারীদের মতো এরাও আল্লাহর বাণীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাই আল্লাহ ওদের পাপের জন্যে ওদেরকে যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশক্তিমান, শাস্তিদানেও কঠোর। ছূরা আনফাল আয়াত ৫০-৫২।

আলোচনাঃ লক্ষ্য করুন! উপরের তিনটি আয়াতের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে (ক) ফেরেশতারা কাফেরদের মেরে মেরে জান কবজ করে, যা মৃত্যু যন্ত্রনা। (খ) “যথোপযুক্ত শাস্তি”। (গ) ফেরেশতারা বলে “এবার জাহান্নামের দহনযন্ত্রণা ভোগ করো” বা জ্বলন্ত আগুনের আযাব আস্বাদান করো । লক্ষ্য করুন! মৃত্যু যন্ত্রনা ও জাহান্নামের শাস্তির কথা একসাথে বলা হয়েছে। এই আয়াতে কোন সময়ের শাস্তির কথা বলা হয়েছে কবরের শাস্তি নাকি জাহান্নামের শাস্তি? উক্ত আয়াতের “কর্মফলের শাস্তি কি শুধুই কবরে”? তাহলে জাহান্নামে কি? উক্ত আয়াতে “আল্লাহ ওদের পাপের জন্যে ওদেরকে যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন”। প্রশ্নঃ যথোপযুক্ত শাস্তি কি শুধুই কবরে নাকি বিচারের পরে? আল্লাহ তো সরাসরি ও সুস্পষ্ট করে বলে দিলেন “যথোপযুক্ত শাস্তি”।

অর্থাৎ ফেরেশতারা মেরে মেরে বুঝাইতে চাচ্ছেন যে, তোমরা জাহান্নামে যাবে বা তোমাদের জন্য জাহান্নাম আছে। অর্থৎ সারা জীবন তো অপরাধ করেছো, আল্লাহর বাণী মেনে নাওনি এবার তোমরা জাহামের শাস্তি ভোগ করো। সেখানে গিয়ে তোমরা জাহান্নামের দহণ যন্ত্রনা বা জ্বলন্তা আগুনের আযাব ভোগ করো। অর্থাৎ তারা যে অপরাধ করতো তার জন্য জাহান্নাম অনিবার্য। অর্থাৎ ফেরেশতারা তাদেরকে জাহান্নামের সংবাদ দিচ্ছেন। কারণ, তারা অবিশ্বাসী এবং অপরাধী হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। এই আয়াতগুলোতে কবর শব্দ নাই। যদি কবরে শাস্তি থাকে তাহলে ফেরেশতাগণ কবর আযাবের কথা না বলে সরাসরি কেনো জাহান্নামের কথা বললেন? ফেরেশতারা কি কবর বলতে ভুলে গিয়েছেন? মা’জাল্লাহ। তাদের কৃতকর্মের জন্য যে জাহান্নামের শাস্তি তাদেরকে ভোগ করতে হবে সেই শাস্তির কথা আগেই এখানে তাদেরকে বলা হয়েছে। এর মানে এই নয় যে, এটা কবরের আযাব, তখন তো সে জীবিত ছিলো। এটা মৃত্যুর সময়ের ঘটনা, কবরে যাওয়ার পরের ঘটনা নয়।

প্রাণ হরণ করার সময় মৃত্যু যন্ত্রনা আর কবরের আযাব এবং জাহান্নামের শাস্তি এক নয়। উপোরক্ত আয়াতের আরও একটি বিষয় লক্ষনীয়, তাহলো কাফের অর্থাৎ যারা আল্লাহ, নবী-রছূল, ক্বুরআন ও পরকাল অস্বীকার করে এবং যাদের জীবনে কোনো ভালো কাজ নাই তারা তো জাহান্নামের আগুনে জলবেই। এই আয়াতে বলা হয়েছে জাহান্নামের কথা। যেমন পুলিশ বড় বড় দাগি আসামী, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিকে ধরে বলে যে, এতদিন তো বহু অপরাধ করেছো এখন জেলের ভাত খাও, যদিও এখনো তার বিচারকার্য শুরু হয়নি এবং শাস্তিও আরম্ভ হয়নি তবুও পুলিশ তাকে জেলের ভাত খাওয়ার কথা বলে। কাজেই উক্ত আয়াতে কবরের শাস্তির কথা বলা হয়নি বলা হয়েছে জাহান্নামের শাস্তির কথা। আর উক্ত আয়াতে কবর শব্দও নাই। আর উক্ত আয়াতে কাফেরদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।

(৫৩) এই আয়াতে কবরের শাস্তি বলা হয়নি এবং কবর শব্দটিও না থাকাতে প্রমাণ হয় যে, এই শাস্তি পকালের শাস্তি তাই এই শাস্তি কবরের কোনো আযাব নয়। 

মৃত্যু যন্ত্রনা/ ছাখরাতুল মাঊত

[৫০:১৯] (আল্লাহ বলেন) আর ছাখরাতুল মাঊত/ মৃত্যু যন্ত্রণা যথাযথই আসবে। যা থেকে তুমি পলায়ন করতে চাইতে। ছূরা ক্বফ আয়াত ১৯।

মৃত্যু যন্ত্রনা/ গমারতিল মাউত

[৬:৯৩]… যদি আপনি দেখতেন যখন জালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের করো স্বীয় আত্মা! অদ্য/ আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াত সমূহ থেকে অহংকার করতে। ছূরা আন’আম আয়াত ৯৩।

আলোচনাঃ অদ্য অর্থ আজ শাস্তি দেয়া হবে অর্থাৎ মৃত্যুর সময় চেহারায় ও পিঠে আঘাত করা হবে। এ শাস্তি শুধুমাত্র মৃত্যুর সময়, সে জন্যই বলা হয়েছে “অদ্য” বা “আজ”, এটা মৃত্যুর পরের শাস্তি নয়। এই শাস্তি যদি কবর আযাব হতো তাহলে ফেরেশতারা বলতো যে, এখন থেকে কবর আযাবের শাস্তি ভোগ করো, কিন্তু ফেরেশতারা তা বলেনি। তাই এটা শুধুই আজ অর্থাৎ জান বের হওয়ার সময়।

(৫৪) কবর আযাবের কথা না বলে ফেরেশতারা “শুধু আজ” শাস্তির কথা বলাতে প্রমাণ হলো যে, এটা কবরে কোনো শাস্তির ব্যপার নয়, তাই কবরে কোনো শাস্তিও নাই।

মৃত্যু যন্ত্রনা

[৪৭:২৭] (আল্লাহ বলেন) তখন কেমন দশা হবে? যখন ফেরেশতারা তাদের মুখে আর পিঠে মারতে মারতে তাদের জান বের করবে। ছূরা মুহাম্মাদ আয়াত ২৭।

আলোচনাঃ আল্লাহ প্রশ্ন করলেন যে, “তখন কেমন দশা হবে”? যদি কবরে আযাব থাকতো তাহলে আল্লাহ কি বলতেন না যে, তখন কেমন দশা হবে যখন ফেরেশতা তাদেরকে কবরে শাস্তি দিবে? আল্লাহ কি তা বলেছেন?

(৫৫) আল্লাহ কবরের কথা না বলাতে এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি নাই।

এক শ্রেণীর মানুষকে মারতে মারতে তাদের জান কবজ করা হয় যা অল্প কিছুক্ষনের জন্য দুনিয়াতেই মৃত্যু যন্ত্রনা। তদ্রু আর এক শ্রেণী যাদেরকে জান কবজ করার সময় ফেরেশতাগণ ছালাম দিয়েছিলো- ১৬:৩২, তাদেরকে কিয়ামতে বলা হবে জান্নাতে প্রবেশ করো- ৩৯:৭৩।

[১৬:৩২] মালাইকা/ ফেরেশতাগণ যাদের মৃত্যু ঘটায় পবিত্র থাকা অবস্থায়, (তাদেরকে) বলবেঃ “ছালামুন আলাইকুম” তোমাদের প্রতি শান্তি! তোমরা যা করতে তার প্রতিদানে জান্নাতে প্রবেশ করো। ছূরা নাহল আয়াত ৩২।

নিরাশ হওয়াও নাকি কবরে মানসিক শাস্তি

ফেসবুকের এক বন্ধু যার নাম প্রকাশ করলাম না তিনি ছূরা মুমতাহিনার ১৩ নং আয়াতটি পেশ করে কবর আযাব সম্পর্কিত একটি পোষ্টের কমেন্টে বলেছেন যে, “নিরাশ হওয়াটাও নাকি কবরে মানসিক শাস্তি”। তবে আমি বলবো এটা কবরের শাস্তি নয়। ঐ আয়াত সম্পর্কে আল্লাহ কি বলেন দেখুন-

[৬০:১৩] (আল্লাহ বলেন) হে মু’মিনগণ! তোমরা এমন সম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না আল্লাহ যাদের প্রতি রাগান্বিত। তারা পরকাল সম্পর্কে তেমনি নিরাশ যেমন কবরবাসী কাফিররা নিরাশ (কারণ তারা পরকালকে অবিশ্বাস করার কারণে তার জন্য কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি)। ছূরা মুমতাহিনা আয়াত ১৩। অনুবাদঃ ব্রাকেটসহ হুবহু তাইসিরুল কুরআন।

আলোচনাঃ এই আয়াতে মৃত্যুর সময় ফেরেশতারা যাদেরকে ছালাম না দিয়ে বরং মেরে মেরে জান কবজ করে তারা তখনই অদেখা ফেরেশতাদেরকে হটাৎ দেখে এবং মার খেয়ে বুঝতে পারে যে, তাদের থাকার জায়গা জাহান্নামই হবে, তাই তারা তখনই নিরাশ হয়ে যায় যে, জান্নাত তাদের ভাগ্যে জোটবে না। নিরাশ হওয়া আর হাজার হাজার বছর কিয়ামত পর্যন্ত কবরে শাস্তি ভোগ করা এক বিষয় কি?

(৫৬) নিরাশ হওয়া যে কবরের শাস্তি নয় এই কথার প্রমাণ দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে প্রাণহীন দেহের জন্য কোনো মানসিক শাস্তি নাই।


অনেকেই মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ক্বুরআন থেকে কিছু আয়াত উপাস্থাপন করে বলে যে, এই আয়াতগুলো কবর আযাবের আয়াত। তাদেরকে বহুবার জবাব দেয়া সত্বেও তারা না দেখার ভান করে থাকে এবং সঠিক কথা মানতে চায় না। ফেসবুকের আর এক বন্ধু যার নামও প্রকাশ করলাম না। তবে চ্যালেঞ্জে আসলে বা প্রয়োজন হলে তাদের আইডি এবং পোষ্টের বিবরণ সবই দেয়া যাবে।

তিনি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২০ তারিখে কবর আযাবের পক্ষে দলীল হিসাবে ক্বুরআন থেকে বেশ কিছু আয়াত উপাস্থপন করে একটি পোষ্ট করেন, যেখানে একটি আয়াতেও কবরর আযাবের কোনো কথা আল্লাহ বলেননি অথচ তিনি বলেছেন। তিনি লিখেছেন (৬৬:১০) (৭১:২৫) (৬:৯৩) (৫২:৪৫-৪৭) (১৪:২৭) (৯:১০১) (১৬:২৮-৩০) এই আয়াতগুলোতে কবর আযাব ও কবরে সওয়াল জওয়াবেরও ইঙ্গিত রয়েছে। এমন কি মৃত্যু যন্ত্রনার আয়াতকেও তিনি কবর আযাব বলে চালিয়ে দিয়েছেন। যেমন, তাদেরকে বলা হলো জাহান্নামীদের সাথে আগুনে দাখিল হও- ৬৬:১০। দাখিল করা হয়েছে আগুনে- ৭১:২৫। যখন জালেমরা মৃত্যু যন্ত্রণায় থাকে- ৬:৯৩। গোনাহগারদের জন্য এ ছাড়াও শাস্তি রয়েছে- ৫২:৪৫-৪৭। ঈমানদারদেরকে মজবুত বাক্য দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের মজবুত রাখেন- ১৪:২৭। ‘‘আমি তাদেরকে দু’বার আযাব প্রদান করবো। তারপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে বৃহত্তম আযাবের দিকে- ৯:১০১। অতএব, জাহান্নামের দরজাসমূহ দিয়ে প্রবেশ কর, এতেই অনন্তকাল বাস কর- ১৬:২৮-৩০ ইত্যাদি।

এই আয়াতগুলোর বরাত দিয়ে ও মৃত্যু যন্ত্রনার আয়াতসহ তিনি বলেছেন যে, কবরে প্রশ্ন করা হয় এবং কবরে শাস্তি দেয়া হয়। শেষের এই ১৬:২৮-৩০ আয়াতটি ২৫ নং আয়াত থেকে পড়ে আসলেই বোঝা যাবে যে, এটি পরকালের আযাবের কথা। আপনারাও ঐ আয়াতগুলো পড়ে দেখবেন। তার কথা অনুযায়ী যদি এই আয়াতগুলো কবর আযাবের আয়াত না হয় তাহলে কিয়ামতের বিচারের দিনে মিথ্যা বলার কারণে তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তার কথা যদি সত্য হয় তাহলে আমি এই পোষ্টে আল্লাহর যেসমস্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণ দেখেয়িছি সেসমস্ত আয়াত মিথ্যা হয়ে যাবে এবং আল্লাহর আয়াতগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হবে- নাইযুবিল্লাহ/ মা’আজাল্লাহ। এবং আমি মিথ্যা বলার কারণে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। উক্ত আয়াতগুলোর মধ্যে এমনও কয়েকটি আয়াত আছে যা বোঝতে হলে অসংখ্য আয়াতের রেফারেন্স টানতে হবে যা পোষ্ট অনেক বড় হয়ে যাবে বলে এখানে আর বললাম না। আর যারা ঐ আয়াতগুলো বোঝবে না তারা ছূরা আল ইমরানের ৭ নং আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর প্রতি সোপর্দ করা ভালো হবে। না বুঝে ঐরকম মিথ্যা তথ্য দেয়া ঠিক না। মোদ্দা কথা হলো তার দেখানো একটি আয়াতও কবর আযাবের আয়াত নয় এবং ঐ আয়াতগুলোতে কবর শব্দও নাই। তবে ক্বুরআনের অপব্যাখ্যা করে শুধু তাদেরকেই বোঝানো যায় যারা ক্বুরআন না বুঝে অন্ধভাবে মানুষের কথার অনুসরণ করে।

.

যারা বলে কবরে আযাব হয় তাদের কাছে প্রশ্নঃ কবরে কতো বছর আযাব দেয়া হবে? কারণ, “আদম” ও “নূহ” এর সময় যারা মারা গেছে তারা হাজার হাজার বছর শাস্তি ভোগ করবে, আর যারা কিয়ামতের ১ মাস আগে মারা যাবে তারা ১ মাস শাস্তি ভোগ করবে এ কেমন অবিচার? আল্লাহ বলেছেন তিনি মানুষের প্রতি অবিচার করেন না, জুলুমও করেন না। আপনারা আল্লাহকে অবিচারকারী বানালেন। (মা’আজাল্লাহ)। যদি মনগড়া বলেদেন যে, তাদের সকলের শাস্তি সমান করে দেয়া হবে তাহলে প্রশ্ন জাগেঃ কিভাবে সমান হবে? এটা কি আপনার মনগড়া কথা? দলীল কি? কিয়ামাতের ১ মাস আগের মৃতো ব্যক্তির শাস্তির ১ মাস পরেই তো কিয়ামত হবে তাহলে সমান করার সময় কোথায়? আল্লাহ কি বলেছেন যে, আমি সকলের শাস্তি সমান করে দেবো? প্রমাণ কি? এ কথা কোন আয়াতে বলা হয়েছে? যারা প্রমাণ ছাড়া কথা বলে তারা মিথ্যাবাদী।.

(৫৭) অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি না পাওয়া বা কাউকে বেশি এবং কাউকে কম শাস্তি দিয়ে আল্লাহকে অবিচারকারী বানানোর দ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবর আযাবের কথা ভিত্তিহীন ও বোনোয়াট, তাই কবরে কোনো শাস্তি নাই।

আজাব দেহে নয় আত্মায় ?

কেউ কেউ বলে শাস্তি হয় আত্মায় বা রূহুতে। যিনি এই কথা বলবেন তার কাছে আমার প্রশ্নঃ রূহু তো আল্লাহর আদেশ মাত্র, আল্লাহ কি বলেছেন যে, আমি পুনরায় আমার আদেশ তথা রূহ কবরে দেহের সাথে মিলিয়ে দেই? যদি বলে থাকেন তাহলে তা কোন ছূরার কতো নং আয়াতে? আর যদি আপনি আয়াত নং দিতে না পারেন তাহলে আপনি মিথ্যাবাদী।

(৫৮) মিথ্যাবাদীরা প্রমাণ দিতে না পারলেই প্রমাণ হবে যে, কবরে কোনো আযাব নাই।

কতো দোয়া শিখালেম কিন্তু কবর আযাবের দোয়া?

মানুষের শান্তির জন্য আল্লাহ ক্বুরআনে বহু দোয়া শিখিয়েছেন, কিন্তু কবরে আযাব থাকলে সেই আযাব থেকে রেহাই পেতে একটি দোয়াও কেনো শিখালেন না? আল্লাহ ক্বুরআনের মাধ্যমে মানুষকে বিভিন্ন দোয়া শিখালেন যেমন, কিভাবে এই দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখেরাতের কল্যাণ চাইতে হবে- ২:২০১। শিখালেন কিভাবে নয়ন জুড়ানো সন্তান চাইতে হবে- ২৫:৭৪। শিখালেন কিভাবে জ্ঞানের জন্য প্রার্থনা করতে হবে- ২০:১১৪। শিখালেন কিভাবে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করতে হবে- ১৭:২৪। শিখালেন কিভাবে কাফেরদের ফেতনা থেকে বাচার জন্য দোয়া করতে হবে- ১০:৮৫-৮৬। শিখালেন কিভাবে শয়তান হতে আশ্রয় চাইতে হবে- ২৩:৯৭-৯৮। শিখালেন কিভাবে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দোয়া করতে হবে- ২৫:৬৫-৬৬ ইত্যাদি ইত্যাদি বহু দোয়া শিখালেন। ক্বুরআন খুলে দেখুন কতো দোয়া কতো প্রার্থনা। কিন্তু যদি কবরে আযাব থাকতো তাহলে কবরের এই ভয়াবহ আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ একটি দোয়াও কি শিখাতেন না? আপনার বিবেক কি বলে? আল্লাহ কি ভুলে গেছেন? “মা’আজাল্লাহ”।

(৫৯) এই একটি মাত্র যুক্তি দ্বারা কি প্রমাণ হয় না যে, কবরে কোনো আযাব নাই।


রছূলের নিজের কথাও নাকি আল্লাহর অহী

অনেকেই বলেন যে, কবর আযাব সম্পর্কে ক্বুরআনে কোনো আয়াত না থাকলেও রছূলুল্লাহ নিজেও বিধান দিতে পারেন। তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে যখন দেখিয়ে দেই যে, রছূল নিজের মন থেকে কিছু বললে আল্লাহ তাঁর হৃৎপিন্ডের শিরা কেটে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন ছূরা হাক্কা আয়াত ৪৪-৪৬। তখন তারা কোনো দলীল প্রমাণ ছাড়াই আবার বলে যে, রছূলের নিজের কথাও আল্লাহর অহী। তাদের এই মনগড়া কথা আল্লাহর আয়াত দ্বারাই বাতিল হয়ে যাবে। আসুন দেখি এ বিষয় আল্লাহ কি বলেন?

আমি আগেই আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ, আমরা সাধারণ মানুষ, পাপী, গুনাগার, মূর্খ্য হওয়া সত্বেও রছূলের শান নিয়ে এ বিষয় কিছু লেখা কিছু বলা উচিৎ নয়। কিন্তু যারা রছূলের নামে মিথ্যা বলে তাদের মিথ্যাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য এবং তাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্য অনিচ্ছা সত্বেও কয়েক খানা আয়াত উপাস্থাপন করতে হলো।

[১০:১০৬] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) …আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না, যে তোমার ভালো ও মন্দও করতে পারে না, তুমি যদি এমন কাজ করো তাহলে তুমিও জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ছূরা ইঊনুছ আয়াত ১০৬।

প্রশ্নঃ রছূল আল্লাহ ব্যতীত অপর কাউকে ডাকলে তাও কি অহী? যদি অহী হয় তাহলে আল্লাহ এই কঠোরতা আরোপ করলেন কেনো?

[৮০:১-১২] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) যে বেপরোয়া তুমি তার চিন্তায় মশগুল হয়ে, যে তোমার কাছে দৌড়ে আসলো তুমি তাকে অবজ্ঞা/অবহেলা করলে কেনো? কক্ষনো এ রকম করবে না। ছূরা আবাছা আয়াত ১-১২। 

প্রশ্নঃ রছূল নিজে কাউকে অবজ্ঞা করলো, তাও কি অহীর মাধ্যমে করেছেন? যদি অহীর মাধ্যমে করে থাকেন তাহলে আল্লাহ ধমক দিলেন কেনো?

[৪০:৫৫] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) তুমি তোমার গুনার জন্য ক্ষমা চাও। (…অছতাগ ফিরলি জাম্বিকা…) ছূরা মু’মিন আয়াত ৫৫। (এটা আদেশ)।

প্রশ্নঃ রছূল কি অহীর মাধ্যমে গুনা করেছেন? (নাউযুবিল্লা/ মা’আজাল্লাহ)।

[৩৪:৫০] (আল্লাহ রছূলকে বলতে বললেন) বলুন, আমি পথভ্রষ্ট হলে নিজের ক্ষতির জন্যেই পথভ্রষ্ট হবো…। ছূরা ছাবা আয়াত ৫০।

প্রশ্নঃ রছূল পথভ্রষ্ট হলে তাও কি অহীর মাধ্যমে হবেন? (নাউযুবিল্লা/ মা’আজাল্লাহ)।

[৩৩:৩৭] আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেন, আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। ছূরা আহযাব আয়াত ৩৭।

প্রশ্নঃ রছূল অন্তরে গোপন করলেন এবং লোক নিন্দার ভয় করলেন তাও কি অহী?

[৬৬:১] হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্যে যা হালাল করছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হারাম করলেন কেনো? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়। ছূরা তাহরীম আয়াত ১।

প্রশ্নঃ আল্লাহর আদেশ অমান্য করে রছূল যা হারাম করলেন তাও কি অহী?

আলোচনাঃ লক্ষ্য করেছেন কি? এই আয়াতগুলোতে রছূলের নিজের কথাগুলো কি অহী হয় নাকি অপরাধ হয়? এই (৬৬:১) আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, রছূল আল্লাহর হুকুম অমান্য করে নিজেই হারাম করাতে আল্লাহ হুসিয়ারী বাক্য উচ্চারণ করলেন। তাহলে রছূল নিজে যা হারাম করেছিলেন তা কি অহীর মাধ্যমেই করেছিলেন? যদি অহী হয় তাহলে আল্লাহ কেনো আবার ধমকের সাথে প্রশ্ন করলেন? ক্বুরআনে এইরকম আরও অনেক আয়াত আছে যা দ্বারা প্রমাণ হয় যে, রছূল অহী ছাড়া নিজের মন থেকে বিধানরূপে কিছুই বলেননি। কাজেই রছূল নিজের মন থেকে কবর আযাব সম্পর্কেও কিছু বলেননি এবং কবর আযাব প্রসঙ্গে রছূলের নাম ব্যবহার করে যতো কথা আবিষ্কার করা হয়েছে তা রছূল নিজেও জানেন না।

(৬০) তাদের এই মনগড়া কথা ক্বুরআনের আয়াত দ্বারা বাতিল হওয়াতে প্রমাণ হলো যে, তারা যে অহীকৃত কবর আযাবের দাবী করে তা মিথ্যা তাই কবরে কোনো আযাবই নাই।

কিয়ামতেই ন্যায় বিচারের মানদন্ড

[২১:৪৭] (আল্লাহ বলেন) আর কিয়ামাতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করবো, অতঃপর কোনো নফছের প্রতি/ কারো প্রতি এতটুকুও জুলুম/ অন্যায় করা হবে না, (কর্ম) সরিষার দানা পরিমাণ হলেও তা আমি হাযির করবো, হিসাব গ্রহণে আমিই যথেষ্ট। ছূরা আম্বিয়া আয়াত ৪৭।

যারা বলে কবরে আযাব হয় তারা আল্লাহকে ন্যায় বিচারক এর পরিবর্তে অবিচারক বানাতে চায়। কারণ, সেদিন সরিষা পরিমানও পাপ থাকলে তা উপস্থিত করা হবে। তাহলে বিচার না করেই কবরে শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কিভাবে অবিচার করবেন? “মা’আ’জাল্লাহ”।

(৬১) এই একটি মাত্র যুক্তিদ্বারাই প্রমাণ হয় যে, কবরে কোনো শাস্তি হয় না।


কবর প্রসঙ্গে গায়েবের কথা 

আল্লাহ বলেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েবের খবর/ অদৃশ্যের খবর জানে না। এবং রছূলুল্লাহ নিজেও বলেছেন যে, তিনি গায়েব জানতেন না। কিন্তু যারা রছূলের নামে হাদীছ বানালো তারা কেনো হাদীছে লিখে দিলো যে, রছূলুল্লাহ গায়েব জানতেন? যেমন, রছূল কবরের পাশ দিয়ে হেটে গেলে বলতে পারতেন যে, এই কবরে প্রশ্রাবের নাপাকির কারণে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। কবরে কি কি আযাব হচ্ছে তাও রছূল দেখতে পেতেন। এই কথাগুলো কি রছূলের প্রতি মিথ্যা অপবাদ নয়? আসুন দেখি গায়েব প্রসঙ্গে আল্লাহ কি বলেন-

[২৭:৬৫] বলুন, আল্লাহ ব্যতীত নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের কেউ গায়বের খবর জানে না এবং তারা জানে না যে, তারা কখন পুনরুজ্জীবিত হবে। ছূরা নামল আয়াত ৬৫।

আলোচনাঃ এই আয়াতে দুটি বিষয় লক্ষনীয় (১) আল্লাহ ব্যতীত কেউ গায়েবের খবর জানে না।

(২) তারা জানে না যে, তারা কখন পুনরুজ্জীবিত হবে?……….

(১) আল্লাহ বললেন যে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েবের খবর জানে না। এই আয়াতের ভিত্তিতে রছূল কি গায়েব জানতেন? জানতেন না। তাহলে কবরে শাস্তি হচ্ছে কি হচ্ছে না তা রছূলের জানার কথা নয়। কিন্তু রছূলের এন্তেকালের বহু বছর পর যারা রছূলের নামে হাদীছ বানালো তারা রছুল গায়েব জানে বলে হাদীছের বাণীতে লিখে দিলো যাতে পরবর্তিতে মানুষের কাছে রছূল দোষি সাব্যস্ত হতে পারে। (মা’আজাল্লাহ)। ইহা কি রছূলের প্রতি মিথ্যা অপবাদ নয়?

(২) এই আয়াতের আরও একটি লক্ষনীয় বিষয় হলো আল্লাহ বললেন যে, তারা জানে না যে, কখন তারা পুনরুজ্জীবিত হবে। তাহলে কবরবাসী যদি কিছুই না জানে তাহলে না জানা মৃতো দেহোকে কিভাবে শাস্তি দেয়া হয়? এটা কি হাস্যকার বিষয় নয়?

(৬২) এই যুক্তি দ্বারাও প্রমাণ হয় যে, যে জানলো না তাকে কবরে কোনো শাস্তিই দেয়া হয় না।

রছূল গায়েব জানেন না তবে কবরের আযাব কি করে জানলো?

[৬:৫০] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) তুমি বলোঃ আমি তোমাদেরকে এ কথা বলিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর ধন-ভান্ডার রয়েছে, তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয়ও অবগত নই/ আমি গায়েবও জানি না…। ছূরা আন’আম আয়াত ৫০।

আলোচনাঃ আল্লাহ ক্বুরআনের মাধ্যমে রছূলকে বলতে বললে যে হে রছূল আপনি বলেদিন যে আমি গায়েবের খবর জানি না। এখন কেউ যদি বলে যে, রছূলুল্লাহ গায়েব জানতেন, রছূল হাজের নাজের, রছূল কবরের শাস্তি দেখতে পেতেন তাহলে সেই ব্যক্তি আল্লাহর আয়াত অমান্য করলো এবং রছূলকেও মিথ্যা অপবাদ দিলো।

(৬৩) এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ হলো যে, রছূল কবর আযাব প্রসঙ্গে কোনো গায়েব জানতেন না তাই রছূলের নামে কবর আযাবের সমস্ত কথাও মিথ্যা।

কিয়ামতে রছূলের সাথে কি ব্যবহার করা হবে রছূল তাও জানতেন না। আল্লাহ রছূলকে বললেন-

[৪৬:৯] বলুন, আমি তো কোনো নতুন রছূল নই। আমি এও জানি না যে, আমার সঙ্গে কী ব্যবহার করা হবে আর তোমাদের সঙ্গেই বা কেমন ব্যবহার করা হবে…। ছূরা আহকাফ আয়াত ৯।

রছূল মৃতের কথা শোনতেন না

আল্লাহ বলেছেন রছূল মৃতো মানুষের কথাও শুনতে পাননা। আপনি কার কথা বিশ্বাষ করবেন? আল্লাহর কথা? নাকি, মানুষের তৈরি করা ও রছূলের নামে লিখিত সত্যমিথ্যায় মিশ্রিত হাদীছের কথা? আল্লাহ বলেন-

[১৯:৯৮] আমি তাদের পূর্বে কতো মানবগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছি। (হে রছূল) আপনি কি তাদের কারও কোনো সাড়া শব্দ পান, অথবা তাদের ক্ষীণতম আওয়াজও কি শুনতে পান? ছূরা মার’ইয়াম আয়াত ৯৮।

আলোচনাঃ আল্লাহর কথায় কি প্রমাণ হলো? কবরে কোনো সাড়া-শব্দ আছে কি? কবরের কোনো শব্দ রছূল পান কি?

(৬৪) এই একটি মাত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, কবর আযাব সম্পর্কিত মিথ্যা হাদীছগুলো রছূলের নামে বানানো হয়েছে? তাই কবরে কোনো আযাব নাই।

মৃতরা শোনে, শোনে না

আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে রছূলকে বলেছেন যে, মৃতদেরকে তুমি কথা শুনাতে পারবে না, তাই মৃতোরা শোনে না। অথচ যারা রছূলের এন্তেকালের বহু বছর পর রছূলের নামে মিথ্যা হাদীছ বানালো তারা হাদীছের বাণীতে লিখে দিলো যে, মৃতোরা কথা শুনতে পায় এবং পায়ের শব্দও শুনতে পায়। আসুন দেখি মৃতের শুনতে পাওয়ার ব্যপারে আল্লাহ কুরআনে কি বলেন-

[২৭:৮০] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) (তুমি মৃতকে শুনাতে পারবে না)। ছূরা নামল আয়াত ৮০-৮১।

[৩০:৫২-৫৩] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) (তুমি মৃত, বধির, ও অন্ধকে শুনাতে পারবে না)। ছূরা রূম আয়াত ৫২-৫৩।

[৩৫:২২] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) আর সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ শ্রবণ করান যাকে ইচ্ছা তাকে। আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে পারবেন না। ছূরা ফাতির আয়াত ২২।

আলোচনাঃ দেখলেন তো! আল্লাহ কি সুন্দরভাবে স্পষ্টকরে কবরবাসীর নাম ধরে সরাসরি রছূলকে বলে দিলেন যে, রছূল কবরবাসিকে শোনাতে পারবেন না, তাদের ক্ষীণতম আওয়াজও রছূল শোনতে পায় না এমন কি কোনো সাড়াশব্দও শোনতে পায় না। এবার দেখুন ক্বুরআন বিরোধী ছহি নামের মিথ্যা হাদীছগুলো কি বলছে?

[বোখারী শরীফ হাদীছ নং ১২৮৭] উক্ত হাদীছ বলছে, রছূল কবরের গর্তের কাছে মুখ রেখে কবরবাসীর সাথে কথা বলতেন এবং রছূল এও বলেছেন যে, তোমাদের চেয়ে কবরবাসীরা বেশি শুনতে পায়। প্রমাণঃ ইসলামি ফাউণ্ডেশন বোখারী শরীফ হাদীছ নং ১২৮৭, এবং ছূনান এ নাছায়ী শরীফ হাদীছ নং ২০:৫৩।

আলোচনাঃ আরও আছে রছূল বলেছেন, কবরবাসীরা উপরের মানুষের পায়ের আওয়াজও শুনতে পায় ইত্যাদি ইত্যাদি আরও অনেক কথা আছে। কিন্তু ক্বুরআনে পরস্পর বিরোধী কোনো বক্তব্য নাই, কোনো অসংগতি নাই বা কোনো বৈপরীত্যও নাই- ছূরা নিছা আয়াত ৮২। আল্লাহ বলেছেন যে, রছূল নিজের মন থেকে বিধানরূপে কোনো কথা বলতেন না। ছূরা হাক্কা আয়াত ৪৪-৪৬। যেখানে আল্লাহ সাক্ষী দিলেন যে, রছূল নিজের মন থেকে কোনো বিধান দিতেন না, সেখানে আল্লাহর আয়াতের বিপক্ষে যেয়ে কিভাবে রছূল কবর আযাবের পক্ষে কথা বলবেন? এবার বিবেচনা করুন কোনটা বিশ্বাস করবেন? আমি উপরের আয়াত থেকে প্রমাণ দেখিয়েছি যে, ক্বুরআন বলছে (১) 

রছূল কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে পারবে না। (২) মৃতকে শুনাতে পারবে না। (৩) মৃত, বধির, ও অন্ধকে শুনাতে পারবে না। অথচ হাদীছগুলো বলছে (১) রছূল কবরের মানুষের সাথে কথা বলতেন। (২) রছূল বললেন, কবরবাসীরা তোমাদের চেয়ে বেশি শুনতে পায়। (৩) কবরবাসীরা উপরের মানুষের পায়ের আওয়াজও শুনতে পায়। (৪) রছূল কবরে প্রশ্রাবের কারণে শাস্তিও দেখতে পেতেন ইত্যাদি ইত্যাদি বহু অসংলগ্ন কথা আছে যা ক্বুরআনের বিরুদ্ধে যায়। এখন আপনি কোনটা বিশ্বাস করবেন? সিদ্ধান্ত আপনার। ক্বুরআন বিশ্বাস করবেন নাকি ছহী নামের ক্বুরআন বিরুধী কবর আযাবের মিথ্যা হাদীছগুলো বিস্বাস করবেন?

(৬৫) উপোরক্ত এলোমেলো হাদীছের কথায় প্রমাণ হয় যে, উক্ত হাদীছের কথাগুলো রছুলের নয়, যা রছূলের নামে মিথ্যা রচনা করা হয়েছে তাই কবরের আযাবের কথাও মিথ্যা।

কবর আযাব প্রসঙ্গে ক্বুরআন থেকে দলীল, প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে ইহাই প্রমাণ হয় যে যারা কুরআন মানেনা তারাই কুরআন থেকে কোন দলিল প্রমাণ না দিয়ে মানব রচিত কিতাব দিয়ে রছুলের নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বা রছুলের দোহাই দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। তবে তারা মুখে মুখে বলে যে, আমরা ক্বুরআন মানি। কুরআনের চেয়ে বড় কোন দলিল পৃথিবীতে নেই। আল্লাহ বলেন-

[২২:৮] কতক মানুষ জ্ঞান; প্রমাণ ও উজ্জ্বল কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে। ছূরা হজ্জ আয়াত ৮।


যারা মানুষের তৈরি বিভিন্ন কিতাব দ্বারা মানুষকে আশা দেয়, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন-

[৩১:৬] একশ্রেণীর মানুষ আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অন্ধভাবে “লাহওয়াল হাদিছ/ অবান্তর “হাদিছ”/ মূল প্রসঙ্গের বহির্ভুত হাদীছ/ কাহিনী সংগ্রহ করে…এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি। ছূরা লুকমান আয়াত ৬।

অর্থাৎ আল্লাহর কুরআনের বাহিরের যতো কাহিনী আছে তা সবই অবান্তর/ লাহওয়াল হাদীছ। যারা আল্লাহর ক্বুরআনে সন্তুষ্ট নয় বা যারা আল্লাহর ক্বুরআন মানে না তারাই রছূলের নামে হাদীছ তৈরি করেছে। তাদের ব্যপারে আল্লাহ বলেন-


নিজ হাতে কিতাব রচনা

[২:৭৯] (আল্লাহ বলেন) তাদের জন্যে আফসোস! যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে রচনা করে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ-[হাদিছও নাকি অহি গায়রে মাতলু]-যাতে এর বিনিময়ে তারা সামান্য কিছু মুল্য গ্রহণ করতে পারে। অতএব তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের হাতের লেখার জন্য এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ, তাদের উপার্জনের জন্যে। ছূরা বাক্বারা আয়াত ৭৯।

আলোচনাঃ উক্ত আয়াতে “ক্বলীলা” শব্দের অর্থ সামান্য। যারা আল্লাহর কিতাবে সন্তুষ্ট নয় তারা মানুষের তৈরি কিতাব দ্বারা বা “অহীয়ে গায়রে মাতলু” বলে মুখ বাকিয়ে চিল্লাইয়া চিল্লাইয়া কবর আযাবের ভয় দেখায়। আল্লাহ বলেন-

মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পড়ে

[৩:৭৮] আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পড়ে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তারা (আল্লাহর) কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা পড়ে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকেই এসেছে, অথচ এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আসেনায়। তারা বলে যে, এটি আল্লাহর কথা, অথচ এসব আল্লাহর কথা নয়। আর তারা জেনে বুঝেই আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে। ছূরা আল ইমরান আয়াত ৭৮।

[৬:১১৯] (আল্লাহ বলেন)…অনেক মানুষ না জেনে না বুঝে নিজের ভ্রান্ত চিন্তা ধারনা দ্বারা/ নিজের খেয়াল-খুশি দ্বারা অন্যকে বিপথগামী করতে থাকে…। ছূরা আন’আম আয়াত ১১৯।

যারা আল্লাহর আয়াত মানে না আল্লাহ তাদেরকে কাফের বলেছেন। আল্লাহ বলেন-

[২৯:৪৭] (…যারা আয়াত মানে না তাঁরাই কাফের)। ছূরা আনকাবূত আয়াত ৪৭।

অস্বীকারকারীরাই অস্বীকার করে

[২:৯৯] হে নবী, আমি আপনার প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশনসহ/ প্রমাণসহ কিতাব নাজিল করেছি। সত্যত্যাগী ছাড়া কেউই এগুলো অস্বীকার করবে না। ছূরা বাক্বারা আয়াত ৯৯।

[৪১:৪১] (আল্লাহ বলেন) নিশ্চয় ক্বুরআন আসার পর যারা তা অস্বীকার করে, তাদের মধ্যে ভাবনা-চিন্তার অভাব রয়েছে। এটা অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ। ছূরা হামীম ছিজদা আয়াত ৪১।

যদি রছূলের গায়েব জানার কথা হাদীছ থেকে বিশ্বাস করি তাহলে আল্লাহর ক্বুরআনের আয়াত অস্বীকার করা হবে, আর যদি ক্বুরআনের কথা বিশ্বাস করি তাহলে হাদীছকে অস্বীকার করা করা হবে। এখন আমরা কোনটা বিশ্বাস করবো হাদীছ না ক্বুরআন? আমরা যাবো কোথায়? যদি বলেন আমরা দোনোটাই বিশ্বাস করবো তাহলে হাদীছ অনুযায়ী রছূল গায়েব জানেন এবং ক্বুরআন অনুযায়ী রছূল গায়েব জানে না, ইহাই কি দোনোটা বিশ্বাস?

সুস্পষ্ট ক্বুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ দিয়েছি যে, কবরে কোনো আযাব নাই কোনো আযাব হয় না, বিশ্বাস করবেন কি করবেন না সে সিদ্ধান্ত আপনার। কবর আযাব সম্পর্কিত প্রথম হতে সপ্তম খণ্ড পর্যন্ত ধারাবাহিক ৭৭ তম পর্ব এখানেই শেষ হলো।


মিথ্যাবাদীদের মিথ্যা রচনা দ্বারা আল্লাহ ও রছূলের প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে।

রছূলুল্লাহ পৃথিবীতে আসার আগেও মিথ্যাবাদীরা পৃথিবীতে ছিলো যারা পূর্বের কিতাবগুলো রদবদল করতো। রছূল উপস্থিৎ থাকাকালীনও সেই মিথ্যাবাদীরা ছিলো এবং রছূল ও আল্লাহর নামে বহু মিথ্যা রটিয়ে ছিলো। ক্বুরআনের হেফাজাতকারী আল্লাহ হওয়াতে ক্বুরআন বিকৃত করতে না পারাতে রছূলের এন্তেকালের পরে সেই মিথ্যাবাদীরা ক্বুরআনের বিধান পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত না রাখার জন্য রছূলের নামে ও আল্লাহর নামে বহু জাল হাদীছ ও মিথ্যা বিধান রচনা করে সারা পৃথিবীতে ছরিয়ে দিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে আজ ধর্মের মধ্যে বহু দল, বহু মত, বহু পথ, বহু তরিকা, বহু ফেরকা ও বহু মাঝহাব তৈরি হয়েছে এবং প্রত্যেক দলই নিজেদেরকে হক বলে দাবী করছে। ঐ মিথ্যা বিধানগুলো রচনা করা হয়েছে একমাত্র ক্বুরআনের বিধানকে আড়াল করার জন্য। এই মিথ্যাবাদীদের ব্যপারে আল্লাহ ক্বুরআনে যা বলেছেন তা পড়ে দেখুন গা শিউরে ঊঠবে। আল্লাহ বলেন-

[৩৯:৩]…(সত্য পথ থেকে সরে গিয়ে মিথ্যে পথ ও মতের জন্ম দিয়ে) তারা যে মতভেদ করছে, আল্লাহ তার চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যেবাদী ও অস্বীকারকারী আল্লাহ তাকে সঠিক পথ দেখান না। ছূরা ঝুমার আয়াত ৩। অনুবাদঃ ব্রাকেটসহ হুবহু তাইছিরুল ক্বুরআন।

আলোচনাঃ আল্লাহ বলেছেন, মিথ্যাবাদীরা মতভেদ করাতে আল্লাহ তাদেরকে সঠিক পথ দেখাবেন না। আল্লাহর কথা অনুযায়ী তারা ক্বুরআনের পথ থেকে যখন সরে গিয়েছে তখন তারা আর সত্য খুজে পায় না তাই তারা মিথ্যার মধ্যে ডুবে থেকে মিথ্যাকেই সথ্য মনে করে, যেমনটি করে গেছে তাদের পিতৃপুরুষগণও। তাই শিক্ষা দেয় মিথ্যা শিক্ষা পায়ও মিথ্যা যার কারণে সত্য পথ সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারনাই নাই। আল্লাহ বলেন-

[১৮:৫] ‘এ সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই, আর তাদের পিতৃ-পুরুষদেরও ছিলো না। তাদের মুখ থেকে বের হয় বড়ই সাংঘাতিক কথা। তারা যা বলে তা মিথ্যে ছাড়া কিছুই নয়। ছূরা কাহাফ আয়াত ৫। অনুবাদঃ তাইছিরুল ক্বুরআন।

আলোচনাঃ এই মানুষগুলো কারা? এখনও ধর্মের নাম দিয়ে বিভিন্ন বক্তার মুখ থেকে বা যে কোনো সময় মানুষের মুখ থেকে সাংঘাতিক মিথ্যা কথা বের হয়, যা সম্বন্দে তাদের কোনো জ্ঞানই নাই এবং যা আল্লাহ ও আল্লাহর রছূলও বলেননি। এই মিথ্যাবাদী কারা? কিভাবে এই মিথ্যাবাদীদের পরিচয় পাওয়া যাবে? আমি আবার প্রশ্ন করছি এই মিথ্যাবাদীরা কারা??? আল্লাহ এই মিথ্যাবাদীদের পরিচয় দিচ্ছেন। আল্লাহ বলেন-

[১৬:১০৫] ‘যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না, তারাই মিথ্যে রচনা করে আর তারাই মিথ্যাবাদী। ছূরা নাহল আয়াত ১০৫। অনুবাদঃ তাইছিরুল ক্বুরআন।

আলোচনাঃ দেখলেন তো! আল্লাহ বললেন যে, যারা আল্লাহর আয়াত তথা ক্বুরআন বিশ্বাস করে না তারাই মিথ্যা রচনা করে। এই মিথ্যা রচনাগুলো কি? ততকালীন সময় ইছলামের শত্রুরা রছূলের শত্রুরা আল্লাহর ক্বুরআনকে আড়াল করার জন্য হাজার হাজার জাল হাদীছ তৈরি করেছিলো যা বর্তমানের মানুষ পড়ে আর বলে এগুলো আল্লার রছূলের হাদীছ। এই মিথ্যা রচনাগুলো আজ পর্যন্ত আলাদা করা হয়েছে কি? এই আয়াতে আরও বোঝা যাচ্ছে যে, যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করবে তারা কোনো অবস্থাতেই ইছলামের মধ্যে বিধিবিধানরূপে বা নিয়ম-কানুনরূপে কোনো কিছুই রচনা করতে পারে না। আর যারা আল্লাহর আয়াত বিশ্বাস করে না তারা হাজারও মিথ্যা বিধান রচনা করবে।

[৪:৫০] (আল্লাহ বলেন) ‘দেখো, এরা আল্লাহর সম্বন্ধে কেমন মিথ্যে রচনা করে, সুস্পষ্ট গুনাহের জন্য এটাই যথেষ্ট। ছূরা নিছা আয়াত ৫০।

আলোচনাঃ এই আয়াতে বোঝা গেলো যে, তারা ঐ মিথ্যা রচনা করে ও পড়ে এমনই গুনাগার ও পথভ্রষ্ট হয়েছে যে তারা আর সত্য খুজে পায় না তাই তাদের কোনো দোয়াও কবুল হয় না। আল্লাহ বলেন-

[৫৪:৩] তারা মিথ্যারোপ করছে এবং নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করছে। ছূরা ক্বমার আয়াত ৩।

[২৯:৬৮] ‘তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে যে, আল্লাহর সম্বন্ধে মিথ্যে রচনা করে আর প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করে যখন তা তাঁর নিকট থেকে আসে? অস্বীকারকারীদের আবাস স্থল কি জাহান্নামের ভিতরে নয়? ছূরা আনকাবূত আয়াত ৬৮। (তাইছিরুল)

আলোচনাঃ আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যে রচনা করে আর প্রকৃত সত্যকে অস্বীকার করে অর্থাৎ এই সম্প্রদায় আল্লাহর দেয়া প্রকৃত ক্বুরআন অস্বীকার করেই আছে। অর্থাৎ ক্বুরআনের কোনো বিধাই তারা মানছে না।

[৩৯:৬০] যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, কেয়ামতের দিন আপনি তাদের মুখমণ্ডল কালো দেখবেন। অহংকারীদের আবাসস্থল জাহান্নামে নয় কি? ছূরা ঝুমার আয়াত ৬০।

[৩৯:৩২] ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে আর সত্য সমাগত হওয়ার পর তা অস্বীকার করে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে? (এমন) অস্বীকারকারীদের আবাসস্থল কি জাহান্নামে নয়? ছূরা ঝুমার আয়াত ৩২। অনুবাদঃ তাইছিরুল ক্বুরআন।

আলোচনাঃ সত্য সমাগত হওয়ার পর তা অস্বীকার করে অর্থাৎ ক্বুরআন আসার পরও সেই মিথ্যার মধ্যে ডুবে থেকে ক্বুরআনকে অস্বীকার করে। ক্বুরআন দ্বারা যাচাই করলে মুষ্টমেয় ছাড়া একজন মানুষও ক্বুরআনের পথে পাওয়া যায় না।

[৬১:৭] যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে আহুত হয়েও আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে; তার চাইতে অধিক যালেম আর কে? আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না। ছূরা ছফ আয়াত ৭।

আলোচনাঃ যে ব্যক্তি ইছলামের প্রতি আহুত হয়েও আল্লাহ সমপর্কে মিথ্যা বলে, এই মিথ্যা কি? কেউকি একবারও ভেবে দেখেছেন যে, এই মিথ্যা কি? যারা মুছলিম হয়েও বা মুছলিম দাবী করেও ধর্মের মধ্যে এমনও বিধান রচনা করেছে যা আল্লাহ বলেনি, রছূলও বলেনি তা সবই আল্লাহ ও রছূলের প্রতি মিথ্যা বলা হয়। সেই মিথ্যা কোন কোন বিধান তা আজ পর্যন্ত কেউ যাচাই করে আলাদা করে ধর্ম থেকে বাদ দিয়েছেন কি?

[১১:১৮] (আল্লাহ বলেন) ‘যারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে তাদের থেকে বড় যালিম আর কে হতে পারে? তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত করা হবে আর সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিবে যে, এই লোকেরাই তাদের রবেবর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলেছিল। শুনে রেখো! আল্লাহর অভিশাপ সেই যালিমদের উপর। ছূরা হূদ আয়াত ১৮। (তাইছি)

[৫২:১১-১২] সেদিন মিথ্যারোপকারীদের দুর্ভোগ হবে, O যারা ক্রীড়াচ্ছলে মিছেমিছি কথা বানায়। ছূরা তূর আয়াত ১১-১২।

কিয়ামতে বলা হবে

[৬:২৮] ‘বরং(আসল ব্যাপার হল) আগে (দুনিয়াতে) তারা (মিথ্যের আবরণে) যা গোপন করে রাখত এখন তা তাদের কাছে প্রকাশ করা হয়েছে আর তাদেরকে (পৃথিবীতে) ফিরিয়ে দেয়া হলে তারা আবারও তা-ই করবে যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, নিশ্চয় তারা হলো মিথ্যুক। ছূরা আন’আম আয়াত ৬:২৪। অনুবাদঃ তাইছিরুল ক্বুরআন।

[৪৫:২৭] নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন মিথ্যাপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ছূরা জাছিয়া আয়াত ২৭।

[৫৬:৫১-৫৬] অতঃপর হে পথভ্রষ্ট, মিথ্যারোপকারীগণ। O তোমরা অবশ্যই ভক্ষণ করবে যাক্কুম বৃক্ষ থেকে, O অতঃপর তা দ্বারা উদর পূর্ণ করবে, O অতঃপর তার উপর পান করবে উত্তপ্ত পানি। O পান করবে পিপাসিত উটের ন্যায়। O কেয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন। ছূরা অক্বিয়া আয়াত ৫১-৫৬।

[৫৬:৯২-৯৫] আর যদি সে পথভ্রষ্ট মিথ্যারোপকারীদের একজন হয়, O তবে তার আপ্যায়ন হবে উত্তপ্ত পানি দ্বারা। O এবং সে নিক্ষিপ্ত হবে অগ্নিতে। O এটা ধ্রুব সত্য। ছূরা অক্বিয়া আয়াত ৯২-৯৫।

[৪৫:৭-৮] প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপাচারীর দুর্ভোগ। O সে আল্লাহর আয়াতসমূহ শুনে, অতঃপর অহংকারী হয়ে জেদ ধরে, যেনো সে আয়াত শুনেনি। অতএব, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। ছূরা জাছিয়া আয়াত ৭-৮।

[৬৮:৮] (আল্লাহ রছূলকে বললেন) অতএব, আপনি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবেন না। ছূরা ক্বলাম আয়াত ৮।

আলোচনাঃ ক্বুরআনের চেয়ে বড় সত্য বাণী এ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। যে ক্বুরআন দিয়ে কথা বলে সেই সত্যকথা বলে। মিথ্যাবাদীরা পূর্বেও ছিলো এখনও আছে। মিথ্যাবাদীরা নিজেরা বভিন্ন ফেরকা ও বিভিন্ন শ্রেণীতে দলভুক্ত হয়ে ক্বুরআন থেকে সমাধান না নিয়ে ইছলামের মধ্যে বিভিন্ন দল তৈরি করে যে যার মতো ইছলামের ব্যাখ্যা দেয়, এবং তাদের অজান্তেই তারা আল্লাহর প্রতি, রছূলের প্রতি ও বিভিন্ন বিষয় মিথ্যারোপ করে। যারা ক্বুরআন থেকে সমাধান নেয় না তাদেরকে পরিচালনা করে শয়তান। এক মিথ্যাবাদিরা অন্য মিথ্যাবাদিদের কাছ থেকে অনুমান ভিত্তিক ফতোয়া গ্রহন করে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়েও আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে। আল্লাহ বলেন-

[২:১৬৯] ‘সে (শয়তান) তোমাদেরকে শুধু অসৎ এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়, আর তোমাদেরকে নির্দেশ দেয় আল্লাহর সম্বন্ধে এমন কথা বলার যা তোমরা জানো না। ছূরা বাক্বারা আয়াত ১৬৯।

[৪৭:২৫] নিশ্চয় যারা সোজা পথ ব্যক্ত হওয়ার পর তৎপ্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্যে তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। ছূরা মুহাম্মাদ আয়াত ২৫।

[৪৩:৩৭] শয়তানরাই মানুষকে বাধা দেয় সৎপথে চলতে। ছূরা ঝুখরুফ আয়াত ৩৭।

[২৬:২২২] ‘তারা (শয়তানরা) অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি চরম মিথ্যুক ও পাপীর নিকট। ছূরা শু’আরা আয়াত ২২২।

[৩:৯৪] (আল্লাহ বলেন) এরপরও যারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যারোপ করবে, তারা যালিম। ছূরা আল ইমরান আয়াত ৯৪।

.আলোচনাঃ এবার ভেবে দেখুন কারা ধর্মের মধ্যে মিথ্যা ঢুকিয়েছে? কি পরিমাণ মিথ্যা ঢুকিয়েছে? কারা আল্লাহর কথা বলে রছূলের কথা বলে বলে ধর্মের মধ্যে হাজার হাজার মতপাথক্য করেছে? এরা কারা? এরা কোথায় বসবাস করে? লণ্ডন/ অ্যামেরিকায় নাকি আপনার আমার পাশে? 

সংকলিত: A B Kamal’s Facebook Posts

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।