পরম করুণাময় আসীম দয়ালু আল্লাহর নামে!

রাসূল মুহাম্মদ কি নিরক্ষর ছিলেন?

মুসলমানদের মধ্যে একটি ভুল ধারনা প্রচলিত আছে যে আমাদের নবী মুহাম্মদ লিখতে এবং পড়তে জানতেন না। প্রশ্ন হচ্ছে এর সত্যতা কি? কোরআনের কোথাও কি স্পষ্ট করে বলা আছে যে আমাদের নবী লিখতে এবং পড়তে জানতেন না? এর উত্তর হচ্ছে না। তাহলে কোরআনের কোন আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে বলা হয় আমাদের নবী লিখতে এবং পড়তে জানতেন না? এর উত্তর হচ্ছে ৭:১৫৭। কোরআনে আল্লাহ ৭:১৫৭ আয়াতে বলেছেনঃ
“সেসমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়……” (৭:১৫৭)

উম্মী শব্দের অর্থ কি?

Edward Lanes Lexicon অনুসারে ক্লাসিক আরবী শব্দ “উম্মী”- অর্থ “জেন্টাইল” অথবা যে নবী মুসা এর আইন (তওরাত) সম্পর্কে অবগত নয় (Those who are not familiar with the law of Moses) অথবা যে লিখতে এবং পড়তে জানেনা অর্থাৎ অক্ষর জ্ঞানহীন। কোন ইহুদী যে তার নিজের গ্রন্থ তওরাত সম্পর্কে অবগত নয় তাকেও উম্মী বলা হয়েছে। যেমনঃ
And among them are unlettered (উম্মী) ones who do not know the Scripture except in wishful thinking, but they are only assuming (২:৭৮)
(এইখানে উম্মী শব্দের অর্থ করা হয়েছে অক্ষরজ্ঞানহীন/ unlettered)

“জেন্টাইল” শব্দটা ল্যাটিন “Gentilis” থেকে এসেছে যার দ্বারা কোন গোত্রের সাথে সম্পর্ক যুক্ত বোঝায়। এইখানে এটা দ্বারা নন- ইহুদিদের বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা ইহুদিদের গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নয় তারাই জেন্টাইল।

কোরআনে উম্মী কি অর্থে ব্যবহার হয়েছে অথবা কোরআনে উম্মী শব্দের কোন অর্থ ব্যবহার সঠিক?

যদি কোরআনে এই উম্মী শব্দের অর্থ নিরক্ষর ধরে নেওয়া হয়, তবে কোরআনের কিছু আয়াতের কোন অর্থ হয় না। যেমনঃ

“যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয় তবে বলে দাও, “আমি এবং আমার অনুসরণকারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্নসমর্পণ করেছি।” আর আহলে কিতাবদের এবং নিরক্ষরদের (উম্মীয়ানা) বলে দাও যে, তোমরাও কি আত্নসমর্পণ করেছ?………… “ (৩:২০)

এই আয়াতে আল্লাহ নবীকে বলছেন পূর্ববর্তী কিতাব প্রাপ্তগনের (ইহুদী এবং খৃষ্টান) এবং “ঊম্মীয়ান” দের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে। এখন যদি এই (উম্মীয়ানা) এর অর্থ নিরক্ষর করা হয় তবে এর সামগ্রকি অর্থের ব্যত্যয় ঘটে। কারন তাহলে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় তাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে যারা কিতাব প্রাপ্ত এবং নিরক্ষর। তাহলে যারা কিতাব প্রাপ্ত নয় এবং লিখতে পড়তে জানে, তাদের কে বাদ দেওয়া হল না? তাদের কাছে কি বার্তা পৌছাতে হবে না? আল্লাহ নিশ্চয় এই রকম কথা বলবে না। বরং এর অর্থ হয় যারা কিতাব প্রাপ্ত এবং যারা কিতাব প্রাপ্ত নয় তাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া অর্থাৎ সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এইখানে উম্মী শব্দের অর্থ “জেন্টাইল” বেশি অর্থবোধক

“তিনিই নিরক্ষরদের (ঊম্মীয়ান) মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ” (৬২:২)

এখানেও উম্মী শব্দের অর্থ নিরক্ষর করলে, অর্থ বিকৃতি ঘটে। যদি এই শব্দের অর্থ নিরক্ষর করা হয়, তবে যা অর্থ দাড়ায় তা হচ্ছে আল্লাহ বলতে চাচ্ছেন আল্লাহ নিরক্ষর মধ্য থেকে রাসুল প্রেরন করেছেন। আরবরা সবাই নিরক্ষর ছিলনা, এমনকি কোরাইশ বংশের সবাই নিরক্ষর ছিল না। তাহলে আল্লাহ কিভাবে সাধারন ভাবে আরবদেরকে অথবা কোরাইশদেরকে নিরক্ষর বলতে পারে? এর সঠিক অর্থ যদি জেন্টাইল হয় তবে এইখানে অর্থ পরিষ্কার, অর্থাৎ আল্লাহ অ-ইহুদী/ যারা পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে ধারনা রাখেনা তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরন করেছেন।

“কোন কোন আহলে কিতাব এমনও রয়েছে, তোমরা যদি তাদের কাছে বহু ধন-সম্পদ আমানত রাখ, তাহলেও তা তোমাদের যথারীতি পরিশোধ করবে। আর তোদের মধ্যে অনেক এমনও রয়েছে যারা একটি দীনার গচ্ছিত রাখলেও ফেরত দেবে না-যে পর্যন্ত না তুমি তার মাথার উপর দাঁড়াতে পারবে। এটা এজন্য যে, তারা বলে রেখেছে যে, উম্মীদের অধিকার বিনষ্ট করাতে আমাদের কোন পাপ নেই। আর তারা আল্লাহ সম্পর্কে জেনে শুনেই মিথ্যা বলে।“ (৩:৭৫)

এইখানে স্পষ্ট ভাবে উম্মী অর্থ অ-ইহুদী/ কিতাব প্রাপ্ত নয় বোঝানো হয়েছে। এইখানে কোথাও উম্মী শব্দ দ্বারা নিরক্ষর বোঝানো হয় নায়।

একটা ইনটারেস্টিং ব্যপার হচ্ছে উপরে উল্লিখিত তিনটি (৩:২০, ৬২:২ এবং ৩:৭৫) আয়াতের মধ্যে ৩:২০, ৬২:২ উম্মী শব্দের অর্থ নিরক্ষর করা হয়েছে এবং ৩:৭৫ এসে শব্দটার কোন বাংলা অর্থ না করে আরবীতেই রেখে দিয়েছে। এর কারন ৩:৭৫ এ এসে সম্মানিত অনুবাদক নিজের প্রচলিত বিশ্বাস কে প্রমান করতে আর গোঁজামিল দিতে পারে নাই।

যাই হোক কোরআনের আলোকে আমরা দেখেছি যদিও উম্মী শব্দের একটি অর্থ নিরক্ষর তথাপি কোরআনের প্রেক্ষিতে উম্মী শব্দের অর্থ জেন্টাইল অর্থবোধক। উম্মী শব্দের অর্থ নিরক্ষর – এটা কোরআনের প্রেক্ষিতে কোন অর্থ বহন করেনা।

সুতরাং কোরআন কি নবী মুহাম্মদ উম্মী অর্থাৎ জেন্টাইল এই ধারনা সমর্থন করে?

উত্তর হচ্ছে-“হ্যা”

“এমনিভাবে আমি আপনার কাছে এক ফেরেশতা প্রেরণ করেছি আমার আদেশক্রমে। আপনি জানতেন না, কিতাব কি এবং ঈমান কি? কিন্তু আমি একে করেছি নূর, যাদ্দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করি। নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন” (৪২:৫২)

এখানে বলা হয়েছে “আপনি জানতেন না, কিতাব কি এবং ঈমান কি?- এর অর্থ পরিষ্কার। অর্থাৎ এর আগে নবী জানত না কিতাব (তওরাত এবং ইঞ্জিল) কি অর্থাৎ পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে নবীর কোন ধারনা ছিল না। এটাই হচ্ছে জেন্টাইলের সংজ্ঞা।

“তুমি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করনি এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখনি যে, মিথ্যাবাদীরা সন্দেহ পোষণ করবে” (২৯:৪৮)

এখানে “কোন কিতাব”- বলতে কোরআন কে বোঝানো হয়নি, পূর্বের কিতাব তওরাত এবং ইঞ্জিল কে বোঝানো হয়েছে। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে নবী পূর্বের কোন কিতাব অর্থাৎ তওরাত এবং ইঞ্জিল পাঠ করেন নি এবং লিখেনও নি, অর্থাৎ পূর্বের কিতাব সম্পর্কে কোন ধারনা নবীর ছিল না। এটাই হচ্ছে জেন্টাইলের সংজ্ঞা।


এখন কোরআনের কোন আয়াতে কি প্রমান পাওয়া যায় যে নবী লিখতে এবং পড়তে জানতেন?

উত্তর- হ্যা।

পূর্বে বর্ণিত আয়াত ২৯:৪৮ দ্বারা এটাও বোঝা যায় যে নবী লিখতে এবং পড়তে জানত। কারন যদি বলা হয় “ক” এর পূর্বে বই “খ” লিখেনি বা পড়েনি, তাহলে এটা দ্বারা “ক” লিখতে এবং পড়তে পারে এটাও বুঝায়। এটা সিম্পল কমন সেন্স। এইখানে আয়াতে বলা “এর পূর্বে” কথাটার দিকে দৃস্টি দিলেই বোঝা যায়।
‘And they say: Fables of the men of old which he has written down (Arabic: ik’tatabaha) so that they are dictated to him morning and evening’ (২৫:৫)

(এই ২৫:৫ আয়াত অনেক অনুবাদক অনুবাদ করতে জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। কারন ট্র্যাডিশন বলে নবী নিরক্ষর, কিন্তু এই আয়াত বলে নবী লিখতে এবং পড়তে জানতেন। এই আয়াত অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক অনুবাদক বাংলায় হোক আর ইংরেজীতেই হোক গোঁজামিল দেবার চেষ্টা করেছেন। সংগত কারনেই আমি এখানে ইংরেজী অনুবাদ দিলাম। কারো সন্দেহ থাকলে আরবী অর্থ ধরে নিজে অনুবাদ করে দেখতে পারেন)

ইক্তাতাবাহাঃ
এর রুট হচ্ছে “কাফ-তা- বা” ডিকশনারি অনুযায়ী এর অর্থ হয় he wrote it, prescribed, appointed, ordained, to dictate it, judged, decreed, drew, brought together, collected, conjoined, a thing in which or on which one writes, record, registered writ.

এই আয়াতে কাফিররা প্রশ্ন তুলেছে যে এই কোরআন নবী নিজেই লিখেছে (he has written down (Arabic: ik’tatabaha) এবং এইগুলি তাকে সকাল সন্ধ্যায় dictate করা হয় লেখার জন্য। কাফিররা জানত নবী লিখতে এবং পড়তে জানে, তাই নবীর বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ করা হয়েছিল। আর কেউ যদি লিখতে না জানে তাহলে কিভাবে আল্লাহ তাকে লেখার জন্য ডিক্টেট করবেন?


এতক্ষন পর্যন্ত যা বলেছি সব কোরআনের রেফারেন্স থেকে। কোরআনের রেফারেন্স থেকেদেখা যাচ্ছে উম্মী শব্দের অর্থ কোরআনের প্রেক্ষিতে “জেন্টাইল” অর্থাৎ অ-ইহুদী অথবা যে পূর্ববর্তী কিতাব সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখেনা। কোরআনের আয়াত দ্বারা আমরা এটাও দেখেছি যে নবী মুহাম্মদ ছিলেন একজন জেন্টাইল নবী। পরবর্তী অংশে আমরা দেখেছি যে নবী মুহাম্মদ লিখতে এবং পড়তে জানতেন তার স্পষ্ট ইঙ্গিত কোরআনে আছে। তাহলে প্রচলিত বিশ্বাস “ নবী মুহাম্মদ একজন নিরক্ষর ছিলেন এর ভিত্তি কি? অবশ্যয় কোরআন না, কারন কোরআনে আমরা এই ধারণার বিপরীত মতবাদ পাই। এই ধরনা তৈরী হয়েছে হাদিস থেকে।


Credit

Unlettered / Ummi in Quranic Context

Print Friendly, PDF & Email