বিদা’আতুন এবং ইফতিরাউন -এর মধ্যে মৌলিক ও গুনগত পার্থক্য আছ

বিদআত (بدعة‎‎) বাংলায় অতি ব্যবহৃত একটি ধারণা যার আভিধানিক অর্থ নতুনত্ব, নবতর উদ্ভাবন। ইসলামে বিদআত পরিভাষাটির দ্বারা ধর্মীয় বিষয়ে নতুন প্রথা উদ্ভাবনকে বুঝায়।মুসলিম সমাজে ‘বিদআত’ সম্পর্কিত বিশ্বাস সম্পূর্ণই ‘হাদীস’ ভিত্তিক যেখানে এটা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, দীনে নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে কারণ প্রত্যেক বিদআতই পথভ্রষ্টতা বা any innovation is forbidden। যদিও ‘বিদআতে হাসানাহ’ নামে অনেক গুরুতর, নব উদ্ভাবিত বিষয়ের সাথে উম্মাহর বিভিন্ন দলে বিভক্ত সদস্যদের সহাবস্থানের গোঁজামিলও ভয়াবহভাবে বিদ্যমান। নব উদ্ভাবন বা বিদা’আতুন অর্থে কুরআনুল কারীমে ‘বিদআতের’ একটি মাত্র উদ্ধৃতি পাওয়া যায়- সেটা ঈসা ইবনে মারইয়াম-এর অনুসারীদের “সন্ন্যাসবাদ (monasticism)” অবলম্বন নিয়ে।

ثُمَّ قَفَّيْنَا عَلَى آَثَارِهِمْ بِرُسُلِنَا وَقَفَّيْنَا بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَآَتَيْنَاهُ الْإِنْجِيلَ وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَامَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا فَآَتَيْنَا الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْهُمْ أَجْرَهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ

অতঃপর আমরা তাদের (নূহ ও ইবরাহীম) পশ্চাতে প্রেরণ করেছি আমাদের রাসূলগণকে এবং তাদের অনুগামী করেছি মরিয়ম তনয় ঈসাকে ও তাকে দিয়েছি ইঞ্জিল। আমি তার (ঈসা ইবনে মারইয়াম) অনুসারীদের অন্তরে স্থাপন করেছি নম্রতা ও দয়া। আর বৈরাগ্য, সে তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে; আমি এটা তাদের উপর ফরজ করিনি; কিন্তু তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এটা অবলম্বন করেছে। অতঃপর তারা যথাযথভাবে তা পালন করেনি। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী ছিল, আমি তাদেরকে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার দিয়েছি। আর তাদের অধিকাংশই পাপাচারী। -৫৭:২৭

আয়াতটি বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, বৈরাগ্যবাদ বা সন্ন্যাসবাদ (رَهْبَانِيَّةً) আল্লাহ যেমন তাদের উপর লিপিবদ্ধ করেন নি; তেমনি যেহেতু তারা এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অবলম্বন করেছিল আর এটি উদ্ভাবনের দ্বারা স্রষ্টার একত্ব, সার্বভৌমত্বের কোন শর্ত লংঘিত হয় নি; তাই আল্লাহ তা’য়ালাও বিষয়টিকে বাতিল করে দেন নি বা তার কোন নিন্দা করেন নি।শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে যারা সেই বৈরাগ্য যথাযথভাবে পালন করে নি, তাদের বিষয়ে শুধুমাত্র খেদ প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে বৈরাগ্য অবলম্বনকারীদের মধ্যে যারা নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী ছিলেন আল্লাহ তাদেরকে পুরস্কৃত করার ঘোষনাও আমাদের জানিয়েছেন।দীনে এটা এক ধরণের কল্যাণকর বা ইতিবাচক উদ্ভাবন (improvisation)। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পর্যায়ে একনিষ্ঠ ইবরাহীমি মিল্লাতের সত্যনিষ্ঠ অনুসারীগণ এ জাতীয় বহু উদ্ভাবনমূলক বিষয়াদি নিজেদের জন্য চর্চা বা অনুশীলন করেন। অভিনব বা নতুন অর্থে ৫৭:২৭-এর বাইরে শেষনবীর ক্ষেত্রে ‘বিদ’আন’-এর ব্যবহার আছে যে, তিনি কোন নতুন রাসূল নন যার মানে তাঁর পূর্বেও তাঁর মতো রাসূল এসেছিলেন।

قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعًا مِنَ الرُّسُلِ وَمَا أَدْرِي مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ

তুমি বলো – আমি রাসূলগণের মধ্যে প্রারম্ভিক নই, আর আমি ধারণা করতে পারি না আমার প্রতি কি করা হবে এবং তোমাদের সম্পর্কেও নয়। -৪৬:৯

কোনরূপ নমুনা ব্যতিরেকেই আসমান-যমীনের উদ্ভাবক হিসেবে আল্লাহ নিজের জন্যও তা ব্যবহার করেছেন-

بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। -২:১১৭, ৬:১০১

ইফতিরাউন – মিথ্যা বলা; অভিযুক্ত করা; অপবাদ দেওয়া

কুরআনে ইবতিদা’উন (বিদআতের ক্রিয়ামূল) সম্পর্কিত আলোচনা এ পর্যন্তই। কিন্তু যে ধারণাটি কুরআনে ব্যাপক এবং অত্যন্ত ভয়ংকর হিসেবে চিহ্নিত তা হলো ‘ইফতিরাউন’ বা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা বা অপবাদ আরোপ; মনগড়া কথা বলা। সম্ভবত, আমরা ইসলামের ইতিহাসের অনেক মিথ্যা বিবৃতির বদৌলতে ইফতিরাউন সম্পর্কিত অত্যন্তি কঠোর নির্দেশগুলোকে বিদা’আতুন-এর সাথে গুলিয়ে ফেলেছি।

মনগড়া কথাবার্তাকে (হাদীসান ইউফতারা) কুরআনের অন্যত্র অসার কথামালা বা লাহওয়াল হাদীসও বলা হয়েছে- এ জাতীয় সকল ভাষ্য, বিবৃতিই ভিত্তিহীন; অর্থাৎ যার বিশুদ্ধতার সপক্ষে আল্লাহ নিজে কোন দলীল নাযিল করেন নাই।

ইফতিরাউন -সংক্রান্ত উদ্ধৃতি কুরআনে মোট ৬০ টি। যেমন. কুরআনুল কারীমকে অবিশ্বাসীরা মানবরচিত মনগড়া বা কাল্পনিক প্রাচীন কাহিনি বলে উড়িয়ে দিতে চাইত।

তারা কি বলে? কুরআন তুমি তৈরী করেছ (أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ)? -১-:৩৮, ১১:১৩, ১১:৩৫, ৩২:৩, ৪৬:৮;

আরও এরই জবাবে আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, সম্ভব হলে তারা যেন তাদের সকল জনবল ও শক্তি প্রয়োগ করে কুরআনের একটি সূরার মতো একটি সূরা তৈরি করে দেখায়। আর এটাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে,

وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآَنُ أَنْ يُفْتَرَى مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ الْكِتَابِ

আর কুরআন সে জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে। অবশ্য এটি পূর্ববর্তী কালামের সত্যায়ন করে এবং সে সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ দান করে যা তোমার প্রতি দেয়া হয়েছে। -১০:৩৭

مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ

এটা কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ। -১২:১১১

ইফতিরাউন-এর দৃষ্টান্ত; কী করলে অপবাদ আরোপ বা মনগড়া কথা তৈরি হয়?

সুনির্দিষ্ট কোন কাজসমূহকে কুরআন ‘মিথ্যা বা মনগড়া’ বলে আখ্যায়িত করেছে যা আল্লাহ কখনও গ্রাহ্য করবেন না তার কতিপয় নমুনা আমরা কুরআন থেকে উপস্থাপন করি।

এক. যে আল্লাহর সাথে শিরক করল, সে আল্লাহর উপর সবচে বড় মিথ্যারোপ করল।

১) إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল। -৪:৪৮

২) আল্লাহ ভিন্ন মনগড়া কোন তাগুতি শক্তি যার সপক্ষে আল্লাহ কোন দলীল নাযিল করেন নাই, তার বিশ্বাস মিথ্যারোপের শামিল।

مَا جَعَلَ اللَّهُ مِنْ بَحِيرَةٍ وَلَا سَائِبَةٍ وَلَا وَصِيلَةٍ وَلَا حَامٍ وَلَكِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَأَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ

আল্লাহ ‘বহিরা’ ‘সায়েবা’ ওসীলা’ এবং ‘হামী’ কে শরীয়তসিদ্ধ করেননি। কিন্তু যারা কাফের, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। তাদের অধিকাংশেরই বিবেক বুদ্ধি নেই। -৫:১০৩

৩) বনী ইসরাইলের যারা গো-বৎসকে দেবতা মেনেছিল তাদের মিথ্যারচনাকারী বলা হয়েছে।

إِنَّ الَّذِينَ اتَّخَذُوا الْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَذِلَّةٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُفْتَرِينَ

অবশ্য যারা গোবৎসকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, তাদের উপর তাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে পার্থিব এ জীবনেই গযব ও লাঞ্জনা এসে পড়বে। এমনি আমি অপবাদ আরোপকারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি। -৭:১৫২

দুই. যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে গ্রহণ না করে বরং মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তারাও একই কাতারে পড়বে।

১) فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآَيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ

অতঃপর তার চেয়ে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে কিংবা তাঁর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে অভিহিত করছে? কস্মিনকালেও পাপীদের কোন কল্যাণ হয় না। -১০:১৭

২) وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآَيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

আর যে, আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথবা তাঁর নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে, তার চাইতে বড় জালেম কে? নিশ্চয় জালেমরা সফলকাম হবে না। -৬:২১

৩) وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ

আর কে বেশী অন্যায়কারী তার চাইতে যে আল্লাহ সন্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে, অথবা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে যখন তার কাছে তা আসে? অবিশ্বাসীদের জন্য কি জাহান্নামে কোনো আবাসস্থল নেই? -২৯:৬৮

তিন. যে নিজেকে আল্লাহর মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে মিথ্যাচার করে

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَيَّ وَلَمْ يُوحَ إِلَيْهِ شَيْءٌ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ

ঐ ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলেঃ আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাযিল করে দেখাচ্ছি যেমন আল্লাহ নাযিল করেছেন। -৬:৯৩

এভাবে ইফতিরাউনের বহুবিধ কুরআনিক দৃষ্টান্ত বিদ্যমান আছে যা মূলত কুরআনের মৌলিক শিক্ষার বাইরে সম্পূর্ণ মিথ্যা রচনা, আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ বা এমন বিবৃতি যা কুরআনের শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখি, তাই সেগুলো আল্লাহর নির্দেশে সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। এ জন্যই দীনে যারা মনগড়া কথা রচনা করে তাদেরকে সবচেয়ে বড় জালেম বলা হয়েছে। আর এই কাজগুলো মানুষকে শয়তানই শিক্ষা দিয়ে থাকে।

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ

এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনকে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথাবার্তা শিক্ষা দেয়। যদি তোমার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না। -৬:১১২

কিন্তু এর বাইরে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, দীনের কল্যাণ কামনায়, মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তব প্রয়োজনে বহুমুখি কাজ, কর্মসূচী স্থান-কাল-পাত্রভেদে আমাদেরকে প্রদত্ত আকল এবং কুরআনী জ্ঞানের সমন্বয়ে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে যা নব উদ্ভাবনের কাতারে পড়তে পারে কিন্তু অবশ্যই তা দীনের বিরুদ্ধে যাবে না বা তা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার বলে গণ্য হবে না।

ইবতিদা’উনের পুনরালোচনা

মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টি যাকে আল্লাহর ফিতরাত থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর সেই ফিতরাত অন্বেষণ করতে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাকে আকল নামক অসাধারণ মৌলিক শক্তি দান করা হয়েছে। তাকে অধিকাংশ (কাছিরান) সৃষ্টিকূলের উপর অধিকতর মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آَدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا

আর আমরা অবশ্য আদমসন্তানদের মর্যাদাদান করেছি, আর আমরা তাদের বহন করি স্থলে ও জলে, এবং তাদের রিযেক দান করেছি উৎকৃষ্ট বস্তু দিয়ে, আর আমরা যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপরে আমরা তাদের প্রাধান্য দিয়েছি শ্রেষ্ঠত্বের সাথে। -১৭:৭০

কাজেই অনেক সুবিধাপ্রাপ্ত ও জ্ঞানবান সেই মানবকূলের কাছ থেকে বহুমাত্রিক সৃজনশীল কাজ তিনি অবশ্যই আশা করতে পারেন; তিনি আমাদেরকে দীনের পথে সহযোগিতা এবং প্রতিযোগিতা -দুটি করতেই উদ্বুদ্ধ করেছেন। দীনের রাস্তায় সামগ্রিক সেইসব উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড করতে কুরআনের ব্যাপকভিত্তিক অনুশীলনের জন্য উর্বর, উন্নত মানসিক অবস্থা আমাদের থাকতে হবে।কুরআনে সালাতের জন্য আহবানের উল্লেখ আছে (আর যখন তোমরা সালাতের জন্য আহবান কর-৫:৫৮; জুমআর দিনে যখন সালাতের জন্য আহবান জানানো হয়-৬২:৯);

কিন্তু পুরো কুরআনে সেই আহবান কীভাবে জানাব তা বলে দেয়া নেই।তাহলে কি কুরআন অসম্পূর্ণ? তা তো হতেই পারে না, কেননা মানবজাতির জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ই সেখানে বিস্তারিত বলা হয়েছে বলে দাবী আছে; কোন কিছুই বাদ দেয়া হয় নাই বলেও ঘোষণা আছে।বস্তুত, সেই অবস্থান থেকেই কুরআনের নূরে আলোকিত মু’মিন-মুসলিমের জন্য উদ্ভাবন পর্যায়ের অনেক অনেক জরুরী কাজ শুরু হয়। কেননা আমাদেরকে যে আকল দেয়া হয়েছে, কুরআনের জ্ঞানে পারদর্শী উলুল আলবাব/আবছার’ ‘উলুল আমরগণ’ সেই বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করবেন। স্থান-কাল-পরিবেশ বা জনগোষ্ঠী ও ভাষাভেদে তার মধ্যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে; তবে অবশ্যই তার মধ্যে কুরআনের শাশ্বত সত্যের বিপরীত কোন বিশ্বাস বা ধ্বনি উচ্চারিত হবে না। অতএব, সালাতের জন্য আহবান সম্বলিত একটি উপায় বের করা ‘ইবতিদা’উনের’ পর্যায়ভু্ক্ত হলেও তা কোনভাবেই ‘ইফতিরাউন’ নয়। আর সেই ‘বিদআত’ দোষনীয় হবার কথাও নয়।এমনকি কোন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘হাই আলাছ্ ছালাহ’-এর বদলে যদি বলা হয় ‘আছ-ছালাতু ফি বুয়ুতিকুম (তোমরা তোমাদের সালাত নিজ নিজ ঘরে কর)’– তখন তা নব উদ্ভাবন হলেও অবশ্যই তা আল্লাহর উপর কোন মিথ্যাচার বা অপবাদ আরোপের শামিল নয়।কুরআনে আমাদের জন্য যে উত্তম বিষয়সমূহের এত্তেবা বা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে (৩৯:৫৫), তার সব কিছুই আল্লাহর বাণী নয়।

আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর অনুগৃহীত বান্দার ভালো, আদর্শস্থানীয় এবং দৃষ্টান্তমূলক কাজের প্রতিও সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন এবং তাকে পুরো মানবজাতির জন্য অনুসরনীয় করতে নির্দেশ দিয়েছেন।আল্লাহর অতি প্রিয় বান্দা লোকমান তার সন্তানকে উদ্দেশ্য করে চিরন্তন নছিহত পেশ করেছেন। এ জাতীয় অনেকগুলো ভাষ্য সূরা লোকমানের আয়াত করা হয়েছে।হে বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ। অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কন্ঠস্বর নীচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর। -৩১:১৭-১৯

এটা এখান থেকে সহজেই বোধগম্য যে, বান্দার কোন কথা, কাজ বা অবস্থা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির মানদন্ড ছুঁতে পারে, তবে আল্লাহ তা নিজের করে নিতে দ্বিধা করেন না।অতএব, আল্লাহ প্রদত্ত মৌলিক আসমানী শিক্ষার উপর ভিত্তি করে মু’মিন-মুসলিমগণ নানাবিধ সৃষ্টিশীল ঈমানী কাজ করবে তাতে আল্লাহর বিরাগভাজন হবার কোন কারণ নেই।

[আমি এই বর্ণনা দ্বারা সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত ‘হাদীস শাস্ত্রকে’ বৈধতা দেবার কোন চেষ্টা করছি না। যদিও সেখানে অনেক সুন্দর, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে, কিন্তু তা আমাদের নবীজির অবিকৃত ভাষ্য সে বিষয়ে আমরা যেমন নিশ্চিত নই; তেমনি তাঁর নামে সেখানে বহুবিধ অসত্য কথামালা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যা আমরা ইসলামের দলীল হিসেবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। কুরআনের শাশ্বত সত্যের সাথে যাচাই সাপেক্ষেই কেবলমাত্র কোন বিবৃতি আলোচিত হতে পারে।]


First Published in Facebook / See original post Ref

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।