কুরআনুল কারীমে দু’ধরনের মসজিদের কথা বলা হয়েছে –

ক) মাসজিদে দেরার

যা মু’মিন-মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়; জিদের বশে এবং কুফরীর তাড়নায় এক এবং অবিচ্ছেদ্য মুসলিম উম্মাহর ক্ষতি করবার জন্য নির্মিত হয়।

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ

আর যারা একটি মসজিদ স্থাপন করলো ক্ষতিসাধনের ও অবিশ্বাসের জন্য, আর বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, আর তার ঘাঁটি স্বরূপ যে এর আগে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, তারা নিশ্চয়ই হলফ করে বলবে- আমরা তো চেয়ছিলাম শুধু ভালো।’’ কিন্তু আল্লাহ্ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে তারা তো আলবৎ মিথ্যাবাদী। -৯:১০৭

আয়াতে ‘ফারাক (বিচ্ছিন্ন বা আলাদা)’ থেকে একটি বিশেষ্য পদ ব্যবহৃত হয়েছে, তাফরিকান (تَفْرِيقًا) – যার অর্থ হচ্ছে বিভক্তিকারী বা বিভেদ সৃষ্টিকারী- সহজে বুঝতে আমরা যাকে বলি ‘ফেরকা’ বা বিভিন্ন দল ‌ও গোষ্ঠী।

আমাদের সমাজে এখনকার মসজিদগুলো দেখলে আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি যে, কোনটি শিয়া, কোনটি সুন্নী বা আহমদী, কোনটি আহলে হাদীস বা হানাফী, ওয়াহাবী, কোনটি কোন বিশেষ ‘পীর’ ঘেষা – সেখানেও আবার তরীকা ও তার পদের কোন খামতি নেই।

আবার কোনটি রাজনৈতিক মতবাদ বা দলীয় এজেন্ডা প্রচারের আখড়া, কোনটি তথাকথিত তাবলিগের বিবদমান দলসমূহের দখলে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। বহু পীরের মুরিদ ভিন্ন কোন পীরের আস্তানা বা মসজিদে তথাকথিত ‘নামাজ’ তো দূরের কথা, সচরাচর গমনাগমনও করে না।

শুধু তাই নয়, একই মসজিদের উত্তর প্রান্তে যদি বসে জাহিলিয়্যাতের ‘জিকিরের হালকা’; তবে দক্ষিণ প্রান্তে বসে ‘হেকায়েতে ছাহাবার’ কথিত ‘তালীম’। মিম্বরের কাছে থাকে আবার পেশাজীবী ইমামের এক বিশেষ মজমা। এর রকমফেরের যেন কোন শেষ নেই।

কুরআনের আয়াত বিচারে এগুলো সবই সেইসব আস্তানা যাকে আল্লাহ স্বয়ং ধিক্কার দিয়েছেন এবং পরের আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর শেষনবীকে কঠোর নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন এ জাতীয় মসজিদে কোনক্রমেই কখনও না দাঁড়ান।

لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا

তুমি কখনো সেখানে দাড়াবে না। -৯:১০৮

এই নির্দেশ একই পরিস্থিতিতে আমাদের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য।

খ) মাসজিদে তাকওয়া

অর্থাৎ এমন মসজিদ যা তাকওয়া বা ধর্মনিষ্ঠার উপরে প্রতিষ্ঠিত; অবিভাজ্য ও অবিচ্ছেদ্য মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে নিবেদিত।

لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ

তবে যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন। -৯:১০৮

মুসলিম উম্মাহর সকল সদস্যই এমন ‘মাসজিদুত তাকওয়ার’ প্রতি দরদ, মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ করে।

কিন্তু কোথায় সেই তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ যেখানে ভেদাভেদ ভুলে, কুরআনের আলোয় আলোকিত সকল মুসলিম সমবেত হতে পারে?

আমাদের সমাজের ধর্ম-ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চক্র তো সকল মসজিদকেই দুনিয়া বাণিজ্যের মোকামে রূপান্তরিত করে ছেড়েছে; অসার কথামালার (লাহওয়াল হাদীস) আখড়ায় পরিণত করেছে।

“ইমাম-আলেম-উলামা”

আমাদের সমাজের মসজিদসমূহের সাথে সম্পৃক্ত যে সব ‘ইমাম-আলেম-উলামা’ আছে, তারাও প্রায় সবাই তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করার কারণে আল্লাহর কুরআনের আয়াত অনুযায়ী ধিকৃত, লাঞ্ছিত, অভিশপ্তরূপে পরিগণিত হয়েছে। এরা সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীব।

তারা তাদের ধর্মীয় বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে অনেক মিথ্যা দিয়ে কুরআনের বহু সত্যেকে ঢেকে দেয়; আর বহু শাশ্বত এবং জাজ্বল্যমান কুরআনী সত্যকে তারা লুকিয়ে রাখে জেনে বুঝে। আর যারা সাধারন মুসলিম সম্প্রদায় থেকে কুরআনী সত্যকে লুকিয়ে রাখে, তাদের প্রতি আল্লাহ নিজে লা’নত বর্ষণ করেছেন।

وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বে সত্যকে তোমরা গোপন করো না। -২:৪২, ৩:৭১

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণের ও। -২:১৫৯

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنَ الْكِتَابِ وَيَشْتَرُونَ بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا أُولَئِكَ مَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ إِلَّا النَّارَ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই ঢুকায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। -২:১৭৪

কুরআনে বহু বহু বার দীনকে দুনিয়া বাণিজ্যে রূপান্তরের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই শ্রেণী সেই কাজটিই বেশি করে যা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছে।

কোন মসজিদের ‘ইমাম’ মানুষের ‘নামাজ’ পড়িয়ে দেবার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন পেশাজীবী মাত্র। সে কোনক্রমেই দীনের প্রতিনিধি নয়; বরং সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির বেতনভুক্ত ‘সার্ভেন্ট’। পুঁতিগন্ধময় কমিটি, আর ভেজাল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেই সে মসজিদের মিম্বর থেকে মানুষের উদ্দেশ্য কথা বলে। আর যা কিছু বলে তা শিরক, নেফাক, মিথ্যাচার এবং কুরআন বিরোধিতায় ভরপুর এক জলসা।

‘জুমুয়ার’ খুতবায় যুগের পর যুগ ধরে যা কিছু মিথ্যাচার করা হচ্ছে তা আমজনতা না বুঝেই হজম করে যাচ্ছে নির্বিবাদে – অথচ তাদের কর্তব্য ছিল যা কিছু বলা হচ্ছে তার সত্যতা যাচাইয়ে উদ্যোগী হবার।

কুরআনে পুনঃপুনঃ বলা হয়েছে, তারচেয়ে বড় জালেম আর কে আছে যে, আল্লাহর বিষয়ে মিথ্যাচার করে।

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَتَمَ شَهَادَةً عِنْدَهُ مِنَ اللَّهِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

তার চাইতে অত্যাচারী কে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে প্রমাণিত সাক্ষ্যকে গোপন করে? আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন। -২:১৪০

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآَيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

আর যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে অথবা তাঁর নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে, তার চাইতে বড় জালেম কে? নিশ্চয় জালেমরা সফলকাম হবে না।-৬:২১

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا لِيُضِلَّ النَّاسَ بِغَيْرِ عِلْمٍ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

অতএব সে ব্যক্তি অপেক্ষা বেশী অত্যচারী কে, যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা পোষন করে যাতে করে মানুষকে বিনা প্রমাণে পথভ্রষ্ট করতে পারে? নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।-৬:১৪৪

আমরা যে বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীর বক্তব্য শুনে ধর্ম-কর্ম করি তা কি আমরা কুরআন দিয়ে যাচাই করে নেই?

কলুষিত মসজিদের ততোধিক কলুষিত, দূষিত ‘ইমামের’ পেছনে ‘নামাজ পড়ে’ বিশাল তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। আমরা আল্লাহকে আমাদের ধর্মপরায়নতার সংবাদ প্রদান করি আর তাঁর কাছে নানা দাবী-দাওয়া পেশ করতে থাকি। আল্লাহ সেখানেও আমাদের মূর্খতার উপর কুঠারাঘাত হেনেছেন-

قُلْ أَتُعَلِّمُونَ اللَّهَ بِدِينِكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

তুমি বলো- কী! তোমরা কি তোমাদের ধর্ম পরায়ণতা সম্পর্কে আল্লাহকে অবহিত করছ? অথচ আল্লাহ জানেন যা কিছু আছে ভূমন্ডলে এবং যা কিছু আছে নভোমন্ডলে। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।-৪৯:১৬

বরং আল্লাহ চান, আমরা যেন তাঁর অবিকৃত, ঐশীবাণী কুরআনের নূর দ্বারা সকল প্রকার কুফর-শিরক-নেফাকের যাবতীয় অপিত্রতা, অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করি। আর একান্ত তাঁরই কাছে নিজেদেরকে সেভাবে সঁপে দিতে পারি যেভাবে একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাতের মাধ্যমে আমাদের জন্য উত্তমাদর্শ (উসওয়াতুন হাসানাহ)-এর দৃষ্টান্ত কুরআনে বর্ণিত ও ঘোষিত হয়েছে। আল্লাহই সম্যক এবং অধিক অবগত!

Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।