কোরআন হলো সমগ্রমানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা ও অনুসরনযোগ্য পথপদর্শন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কোরআনে আমরা সার্বজনীন এমন কিছু দিকনির্দেশনা পাই যা যদি সকল জাতি অনুসরন করতো তাহলে মানুষের জীবনযাপন ও শান্তি সুনিশ্চিত হতো, মানুষের সৃষ্টিকরা দুর্ভোগ অনেকাংশেই কমে আসতো।

আমরা জানি পৃথিবীতে সংঘাত ও যুদ্ধ প্রায় সৃষ্টির শুরু থেকেই হয়ে আসছে। আমাদের এই সময় ও তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার আমলেও আমরা দেখি যে জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ এখনও থামে নি। জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ অনেক কমেছে এটা সত্য কিন্তু পুরোপুরি নির্মুল হয় নি। খুব সাম্প্রতিক সময়েই যদি লক্ষ্য করা যায় তাহলে আমরা দেখবো ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, কুর্দিস্তান, সোমালিয়া, আফ্রিকার মাগরেব, লিবিয়া, কলাম্বিয়া, দক্ষিন সুদান, নাইজেরিয়া এরকমন অনেকগুলো দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও হানাহানির পরিস্থিতি রয়েছে । (উইকিপিডিয়ায় চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পর্কে বিস্তারিত দেখুন।)

যেকোন যুদ্ধ ও সংঘাতের সময়ে নিরাপরাধ সাধারন মানুষের জন্য তা বয়ে নিয়ে আসে অপরিসীম কষ্ট ও দুর্যোগ। খাবার, পানি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জানমালের নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। যুদ্ধবাজরা ব্যস্ত থাকে তাদের স্বার্থ ও যুদ্ধ নিয়ে, কিন্তু সাধারন জনসাধারনের দু:খকষ্ট তখন চাঁপা পড়ে যায় যুদ্ধের মাতমে।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে কোরআনে আমরা দেখি একটি মানবিক সমাধান। স্রষ্টা কোরআনে খুব পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীণ ভাষায় মানুষকে জানিয়েে দিয়েছেন যে পৃথিবীর ইতিহাসের শুরু থেকে স্রষ্টার বিধানে মাস মোট বারোটি।

এর মধ্যে পবিত্র বা সব ধরনের সংঘাত থেকে মুক্ত বা হানাহানি নিষিদ্ধ মাস হলো চারটি।

মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময় থেকেই জারি করা বিধান অনুসারে আল্লাহর কাছে গণনার জন্যে মাস হচ্ছে ১২টি। এর মধ্যে চারটি মাস (হিংসা-সংঘাত) নিষিদ্ধ মাস। এটি স্থায়ী বিধান। অতএব এর মধ্যে তোমরা নিজেদের ওপর জুলুম কোরো না। আর শরিককারীরা যেভাবে একাট্টা হয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও সঙ্ঘবদ্ধভাবে ওদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে সর্বস্বত্যাগে প্রস্তুত থাকো। জেনে রাখো, আল্লাহ-সচেতনদের সাথে আল্লাহ সবসময়ই থাকেন।

সুরা তওবা, ৯:৩৬

পূর্বে এই চারটি মাসকে অদলবদল করার একটি প্রথা প্রচলিত ছিলো যা আল্লাহ কোরআনে নিষেধ করেছেন।

মাস পিছিয়ে দেয়া ওদের দিক থেকে সত্য অস্বীকার করার আরেকটি উদাহরণ। এ প্রক্রিয়ায় সত্য অস্বীকারকারীরা আরো বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়। ওরা একবছর একটি মাসকে নিষিদ্ধ করে আবার আরেক বছর একে বৈধ করে। ওদের উদ্দেশ্য একটাই। তা হচ্ছে, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন, তাকে যেন ওরা বৈধ করতে পারে। এভাবে মাস গণনা হলো আবার নিষিদ্ধ মাস বৈধও হলো। ওদের মন্দ কাজগুলোও ওদের কাছে আকর্ষণীয় ও চাকচিক্যময় হয়ে ওঠে। আসলে আল্লাহ সত্য অস্বীকারকারীদের সৎপথ প্রদর্শন করেন না।

সুরা তওবা ৯:৩৭

প্রশ্ন হলো এই পবিত্র চারটি মাস কোনগুলো?

আরবী ১২টি মাস হলো:
১. আল-মুহারাম (এটির নামই হলো নিষিদ্ধ মাস)
২. সফর
৩. রবি উল আউয়াল
৪. রবি আস সানি
৫. জুমাদা আল আওয়াল
৬. জুমাদা আস সানি
৭. রজব
৮. শাবান
৯. রমাদান
১০. শাওয়াল
১১. যিল কা’দাহ (মাসটির অর্থ হলো বিরতি বা যুদ্ধ বিরতি, বসে থাকা)
১২. যিল হজ্জ (হজ্জের মাস)

হাদীস ও মানুষের মতামত নির্ভর তাফসিরকারকরা বলে থাকেন যে: চারটি যুদ্ধ ও সংঘাত নিষিদ্ধ মাস হলো যিল কা’দ, যিল হজ, মুহাররাম ও রজব।

শুধুমাত্র কুরআন থেকে বিধান নেওয়ার যারা পক্ষপাতী তাদের বিশ্লেষণ অনুসারে দুটি বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। প্রথম বিশ্লেষণ (ড. সাব্বির আহমেদ) অনুসারে এই চারিটি মাস যিল হজ্জ থেকে শুরু করে তার পরের তিনটি। সেক্ষেত্রে এই মাস চারটি হলো:

যিল হজ্জ (১২ তম মাস), মুহাররম (বছরের ১ম মাস), সফর (২য় মাস) ও রবিউল আওয়াল (৩য় মাস)।

এর পেছনের যুক্তি হিসেবে তওবার ১ থেকে ৫ এবং ৩৬ নং আয়াতকে রেফারেন্স ধরা হয়। এর কারন হলো: হজের বড় দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হচ্ছে… অর্থাৎ ঘোষণাটি যিল হজ্জে দেওয়া হয়। সে কারনে চারিটি মাস সেটি থেকে গনণা করাই যুক্তিসংগত।

ড. সাব্বির আহমেদ, কুরআন এজ ইট এক্সপ্লেইন ইটসেলভ অনুবাদে লেখেন:

Temporary cessation of hostilities provides a cooling off period and it can avert war. History and Tafseers expositions of the Qur’an report the four Months of Peacetime as the first, the seventh, the eleventh and the twelfth month of the Lunar Calendar. However, the Qur’an being the Ultimate authority specifies them differently. The four Months of Security begin with the Month of Pilgrimage, Zil-Hajjah, the 12th Lunar Month. 9:5, 9:36

Mankind, through international treaties, must agree to shun all kind of warfare during these four months. This will give them a cooling off period that sense may prevail over emotions. Four Sacred Months for peacetime: 2:194, 9:1-5. From the 12th lunar month of Pilgrimage to the third month


আবার অন্য আরেকটি মতে, এই নিষিদ্ধ মাস হলো:

রমাদান, শাওয়াল, যিল কা’দাহ এবং যিল হজ্জ।

শওকত জাওহারের লেখনী থেকে:

“সূরা তাওবার ১-৩৭ আয়াতের প্রেক্ষিতে বলা যায়, রমাদানের প্রথম তারিখ হচ্ছে হজ্জের প্রথম মাসের প্রথম তারিখ, আয়াতসমূহ নাজিলকালীন বছরের রমাদানের প্রথম তারিখকে ‘ইয়াওমিল হাজ্জিল আকবার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্যগত সিদ্ধান্তের কারণ, রমাদানের প্রথম তারিখ প্রথম হারাম মাসের প্রথম তারিখ না হলে মুশরিকদেরকে দেয়া হারাম চারমাসের অবকাশ পূর্ণ হয় না। আবার প্রথম হারাম মাসের প্রথম তারিখ ইয়াওমিল হাজ্জিল আকবার না হলে ইয়াওমিল হাজ্জিল আকবারের দিন থেকে মুশরিকদেরকে দেয়া হারাম চারমাসের অবকাশ পূর্ণ হয় না। সুতরাং হারাম চারমাসই হজ্জের মাস। আবার এ চারমাসের মধ্যে প্রথম মাসটি রমাদান একই সাথে সিয়ামের মাস। রমাদান মাস সিয়ামের মাস হওয়ার কারণেও হারাম মাস, হজ্জের মাস হওয়ার কারণেও হারাম মাস।

এ প্রসংগে পরিশেষে বলা যায় যে, আল কুরআন অনুযায়ী, রমাদান মাস থেকে পরবর্তী তিনমাসসহ মোট চারমাস হচ্ছে হারাম মাস ও হজ্জের মাস এবং এর মধ্যে প্রথম মাস হচ্ছে একই সাথে সিয়ামের মাস। যারা রমাদানকে বাদ দিয়ে রজব মাসকে হারাম মাসের তালিকাভুক্ত করেছেন তারা নাসী (হালাল ও হারাম মাসের রদবদল) করেছেন, যা তাদের কুফরির উপর আরো একটি কুফরি (৯:৩৭)।
.
আর যারা মাসসমূহের প্রচলিত ক্যালেন্ডারে থাকা ক্রমিক (প্রথম মাস- মহররম, ……… দ্বাদশ মাস- জিলহজ্জ) সঠিক ধরে নিয়ে মনে করছেন যে, জিলহজ্জ, মহররম, সফর, রবিউল উলা (দ্বাদশ-প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়) এ চারমাস হারাম মাস তাদের কথাটিও গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত হয় না। কারণ (১) যদি বলা হয়, মহররম/১ম, সফর/২য়, রবিউল উলা/৩য় এবং জিলহজ্জ/১২শ মাস হচ্ছে হারাম মাস এবং হজ্জের মাস। তাহলে চারটি হারাম মাস পরপর হয় না, বরং প্রথম তিনটি হারাম মাস পরপর হয়ে তারপর আট মাসের গ্যাপ হয়ে পরে আরেকটি হারাম মাস হয়, যা আল কুরআনের বর্ণনা বিরুদ্ধ, তাই এটি বাতিল। (২) যদি বলা হয়, জিলহজ্জ/১২শ মাস থেকে হজ্জ ও হারাম মাস শুরু এবং পরপর চারমাস তথা জিলহজ্জ/১২শ, মহররম/১ম, সফর/২য়, রবিউল উলা/৩য় এই পরপর চারমাস হারাম মাস।

তাহলে ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকা হলো, অথচ আল্লাহর আদেশ ঘরের সামনের দরজা দিয়ে ঢুকা (২:১৮৯)। আর এভাবে একই গণনাচক্রে/ বর্ষে পরপর চারমাসকে হারাম হিসেবে পাওয়া যায় না, বরং দুটি গণনাচক্রে/ বর্ষকে একসাথে ধরে পরপর চারমাস হারাম পাওয়া যায়, যার দ্বিতীয় বর্ষে এছাড়াও একটি হারাম মাস (দ্বাদশ মাস) পাওয়া যায়, যেটি আবার তৃতীয় আরেকটি বর্ষকে একত্র না করলে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। অথচ আল কুরআন অনুযায়ী মাসসূহের একটি ইদ্দাত/ গণনাচক্র হলো ১২ মাস, যার মধ্যে ৪ মাস হারাম। সুতরাং জিলহজ্জ থেকে রবিউল উলা হচ্ছে হারাম মাস এবং হজ্জের মাস এই মতটি বাতিল। এছাড়া এ মত অনুসারে, রমাদান মাস হারাম মাস থেকে বাদ পড়ে যায়, অথচ রমাদান মাসে দিনের বেলায় পানাহার ও যৌনক্রিয়া এবং এতেকাফকারীর জন্য রাতের বেলায়ও যৌনক্রিয়া হারাম, সুতরাং নিশ্চিতভাবে এ মাসটি হারাম মাস। সুতরাং সকল দিক থেকে এটা স্পষ্ট যে, হারাম চার মাস হচ্ছে রমাদান মাস থেকে পরবর্তী তিনমাসসহ মোট চারমাস, যেগুলো হজ্জের মাস, যার প্রথম মাসটি একই সাথে সিয়ামের মাস।
.
উল্লেখ্য, হারাম মাসসমূহের প্রথম মাসে তথা রমাদান মাসে যে ব্যক্তি হজ্জ করবে সে ব্যক্তি হজ্জের সফরকালীন সময়ে রমাদানের সিয়াম পালন করবে না। তা পরবর্তীতে অন্য দিনে করবে। (২:১৮৪-১৮৫)। অবশ্য যদি কুরবানিতে অংশগ্রহণ করতে না পারে তবে ফিদইয়াস্বরূপ হজ্জের তিনদিন সিয়াম পালন করবে, সেক্ষেত্রে সে কুরবানি থেকে দিনের বেলা খেতে পারবে না (২:১৯৬, ২:১৮৭)।” (সুত্র লিংক)


যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসে কেবলমাত্র আক্রান্ত হলেই একমাত্র যুদ্ধ করা যাবে নিজেদের রক্ষা করার জন্য।

পবিত্র মাসই পবিত্র মাসের বিনিময়। পবিত্র মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা সব পক্ষেরই দায়িত্ব। তাই কেউ যদি পবিত্র মাসে তোমাদের ওপর আক্রমণ চালায়, তোমরাও পাল্টা আক্রমণ করবে। তবে সবসময় আল্লাহ-সচেতন থেকো। জেনে রাখো, আল্লাহ সবসময়ই সত্য-সচেতনদের সাথে থাকেন।

সুরা বাকারা ২:১৯৪
Print Friendly, PDF & Email

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।